সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ শিল্পগোষ্ঠীর দেশে ও দেশের বাইরে ৭৬ হাজার কোটি টাকা আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এর ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে।
গতকাল বুধবার বিএফআইইউ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে বিএফআইইউয়ের প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন সাংবাদিকদের সামনে এ প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে প্রতিবেদন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশের মধ্যে জব্দ করা হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বিদেশি সম্পদ জব্দ করা হয়। দেশ থেকে চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে জানিয়ে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, বছরের শেষে সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে সুখবর দিতে পারব। আমরা দল-মতের দিকে তাকাই না। সন্দেহজনক হলেই ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ করে থাকলে, সেটাও সামনে আসবে।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) ও ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের (এসএআর) প্রতিবেদন। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা ৭৪ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।
অনুষ্ঠানে বিএফআইইউয়ের প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, সরকার পতনের পর সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং বেশি হয়েছে। এবার সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি পাওয়া গেছে। আগে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাঠাতে ব্যাংকগুলো ভয় পেত। এখন তাদের মধ্যে সেই ভয় নেই। তাই ব্যাংকগুলোর রিপোর্ট বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, কেউ সন্দেহজনক লেনদেন করলে দলমতের দিকে তাকানো হয় না। সন্দেহজনক লেনদেন যেই করুক, তাকে কোনো ছাড় নেই।
বিএফআইইউয়ের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫টি সন্দেহজনক প্রতিবেদন জমা পড়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি প্রতিবেদন জমা পড়েছিল। সেখানে চার বছরের ব্যবধানে সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২, যা ২০১৫ সালে সংশোধিত হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো (রিপোর্টিং সংস্থা) সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিতে আইনগতভাবে বাধ্য। কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা কার্যক্রম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিলম্ব না করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়।
অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন বেড়েছে : অনলাইন জুয়া ও বাজি, বৈদেশিক মুদ্রা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও ডিজিটাল হুন্ডির মতো সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছে বিএফআইইউ। এ জন্য সংস্থাটি এই ধরনের লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।
বিএফআইইউয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক প্রতিবেদন বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি, আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি, লেনদেন পর্যবেক্ষণ ও সন্দেহজনক আচরণ শনাক্তে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা বৃদ্ধি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন