ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞ

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে যেকোনো সময় চার্জশিট

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ১২:৫২ এএম

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে প্রসিকিউশন। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজসহ ৪১ জনকে এতে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, বেসরকারি টেলিভিশনটির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর। সেই সঙ্গে তৎকালীন পুলিশ ও র‌্যাবের প্রধানসহ ডিএমপি কমিশনারকেও এতে আসামি করা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার এ মামলায় আনুষ্ঠানিক চার্জ দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।

গতকাল রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। নিহত ৬১ জনের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে প্রসিকিউশন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকা-। একদম পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কারণ, যখন ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই সংগঠনকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য নানা পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘নারকীয় হত্যাকা- নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তারা। প্রতিবেদনটি এখন পর্যালোচনা বা চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। যেন একটি সঠিক তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিচার হয়। প্রকৃত আসামিরা যেন বিচারের সম্মুখীন হন। এ জন্য হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে খসড়া প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছি। শিগগিরই পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে পাব বলে আশা করছি।’

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শাপলা চত্বরের নারকীয় হত্যাকা- নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তারা। প্রতিবেদনটি এখন চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। যেন একটি সঠিক তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত হয়। প্রকৃত আসামিরা যেন বিচারের সম্মুখীন হন। হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে খসড়া প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছি। শিগগিরই পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে পাব বলে আশা করছি।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, খসড়া প্রতিবেদন হওয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে আসামিদের নাম সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। হেফাজত ইসলামের নেতারা এ ঘটনার জ¦লন্ত বা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তারা এ বিষয়ে আরও বেশি ওয়াকিবহাল রয়েছেন। আমাদের তদন্তের ওপর তাদের আর কোনো বক্তব্য থাকলে নিশ্চয়ই বলবেন। তবে কে আসামি হবেন, আর কে হবেন না, তা ফরমাল চার্জ দাখিলের পরই সবাই জানতে পারবেন।

এদিকে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের মামলার অগ্রগতি জানতে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এসেছেন দলটির শীর্ষ নেতাসহ ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল। গতকাল রোববার সকালে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদের (মধুপুর পীর সাহেব) নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ সদস্যের ওই প্রতিনিধিদল চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিস এবং জুবায়ের আহমেদসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডিশনাল আইজিপি শহীদুল্লাহ এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে খসড়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর গতকাল ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে চিফ প্রসিকিউটর এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর গভীর রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে শাপলা চত্বর খালি করে। ওই অভিযানে বহু মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত চলছে।

খসড়া প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা, পুলিশ ও বিজিবি প্রধান আসামি : মামলার আসামিদের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘খসড়া তালিকায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সেখানে পুলিশ-প্রধান, বিজিবি-প্রধানসহ এরকম কয়েকজন আমরা মোটা দাগে বলতেই পারি যে তাদের বিরুদ্ধে একটা খসড়া রিপোর্ট এসেছে, সেটা আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব। তবে এখনই সব আসামির নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে তিনি বলেন, আসামিদের তালিকা যেহেতু একটি খসড়া, চূড়ান্ত প্রতিবেদন যেহেতু আমরা রিসিভ করিনি, তালিকাটা আমরা প্রকাশ করতে চাইছি না। অনেক আসামি আছে, তারা হয়তো এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। নাম প্রকাশ করলে সেই আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অসুবিধা হবে। সাধারণ আদালতের বদলে ট্রাইব্যুনালে এই বিচার কেন হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এটিকে সুপরিকল্পিত ও সিস্টেমেটিক হত্যা বলে আখ্যা দেন। এটা অবশ্যই একটা সিস্টেমেটিক অফেন্স। এটা ওয়াইড স্প্রেড এবং টার্গেটেড কিলিং। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি আছে, লোকাল পারপেট্রেটরদের ইনভলবমেন্ট আছে। পরিকল্পিতভাবে হেফাজতে ইসলাম যখন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই জনগোষ্ঠীকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য তারা নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের চূড়ান্ত জায়গা থেকে তাদের কোথাও বসতে দেওয়া হয়নি। এটা শুধু ঢাকায় নয়, নারায়ণগঞ্জে ঘটেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটেছে। রাষ্ট্রের সব অর্গানকে এটার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। আমি মনে করি, এটি এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত সবচেয়ে উপযুক্ত একটি ঘটনা।

নিহতের সংখ্যা ও হেফাজতের অবস্থান : নিহতের সংখ্যা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা প্রায় ৬১ জনের একটা তালিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা ৫৮ জনকে ইতোমধ্যে আইডেন্টিফাই (শনাক্ত) করতে পেরেছি। এ সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘নিহতদের যে সংখ্যা, এই সংখ্যাটা আসছে আমাদের আলোচনায়ও এবং তদন্তের মধ্য দিয়ে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। আমরা আগাগোড়াই বলছি যে এখানে অনেক মিসিং (নিখোঁজ) আছে, যাদের কোনো হদিসই নাই। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন শাপলার শহিদদের গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।’

নিহতদের পরিচয় প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, এখানে শহিদদের মধ্যে আমাদের স্টুডেন্টদের পোরশনটা (অংশ) কিন্তু খুবই কম। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র, বুয়েটের ছাত্র, ট্রাকড্রাইভার, শ্রমিক, তৎকালীন প্রায় সব বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মীরাও এই শহিদদের তালিকার মধ্যে আছেন বলেও দাবি করেন হেফাজতের এই নেতা। খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন আছে। আমরা আরেকটু পর্যালোচনা করে দুই-এক দিনের মধ্যেই কারেকশনের কথাগুলো ওনাদের বলব। তবে আমাদের যে এক্সপেক্টেশন (আশা) ছিল, আমাদের যে অভিযোগ ছিল, এই খসড়া রিপোর্ট তার কাছাকাছিই আছে।

পুলিশের তদন্তে পক্ষপাতিত্বের শঙ্কা নাকচ : মামলার তদন্তে কোনো চাপ ছিল না জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম বলেন, ‘এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে ঢোকানোর ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো চাপ ছিল না। শুরু থেকে প্রসিকিউশন টিম আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে ছিল। প্রতিটি বিষয়ে ওনাদের কনসার্ন নেওয়া হয়। পুলিশ হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে নিরপেক্ষতা কতটুকু থাকছে এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া আছে। আমরা তো বহু পুলিশকে আসামি করেছি। কে পুলিশ, কে পাবলিক, এইভাবে দেখে ইনভেস্টিগেশন হয় না। আমরা অপরাধীকে দেখে ইনভেস্টিগেশন করি।’

২১ জুলাই ফরমাল চার্জ দাখিল : মামলার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের কোনো আসামি যদি নিরপরাধ হয়, তাকে আমরা আনব না। কিন্তু কোনো দোষী আসামি যাতে বাদ না পড়ে যায়, সে জন্যে আমরা এই সতর্কতা অবলম্বন করছি। সে কারণেই আমরা হেফাজতের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলাম, পরামর্শ নিলাম। আমি আশা করছি যে, আগামী ২১ তারিখে আমাদের ট্রাইব্যুনাল খোলার দিনই আমি বাদী হয়ে আমাদের ফরমাল চার্জটা দাখিল করতে চাই।’

এর আগে গত ৮ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, ১৩ বছর আগের ওই ঘটনার তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি শেষে ২১ জুলাই বিচারকাজ শুরু হলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) জমা দেওয়া হবে। এই মামলায় আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ আরও অনেকের নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং সাংবাদিক  মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা, শাহরিয়ার কবীরও এই মামলায় আসামি হচ্ছেন বলে প্রসিকিউশন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।