ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ককরোচ পার্টির আন্দোলন

প্রশ্নফাঁসে জনরোষ ভারতজুড়ে

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৫:৩২ এএম

ভারতে চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন দেশজুড়ে এক বৃহৎ গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে। প্রথমে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি ও পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এই আন্দোলন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের জবাবদিহির দাবিতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী দিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পার্লামেন্টের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

উত্তপ্ত পরিস্থিতি পার্লামেন্টে : বিরোধী দলগুলো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে পার্লামেন্টে বিক্ষোভ করে। বিরোধী সাংসদেরা শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কালো পোশাক পরে সংসদ ভবনের বাইরে অবস্থান নেন। পরে তারা সংসদের ভেতরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আলোচনা দাবি করলে অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতবি করতে হয়। এদিকে সরকার জানিয়েছে, তারা শিক্ষা সংস্কার ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত।

সংসদে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

রাজপথে হাজারো তরুণ : গত মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রকাশের পর থেকেই আন্দোলনের সূচনা হয়। এতে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে দাবি করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে আন্দোলন : দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, গোয়া, গুয়াহাটি, তিরুবনন্তপুরম, জম্মু ও আহমেদাবাদসহ একাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

বদলে যাচ্ছে আন্দোলনের চরিত্র : শুরুতে আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। কিন্তু এখন আন্দোলনকারীরা শুধু একজন মন্ত্রীর অপসারণ নয়, বরং পুরো সরকারের জবাবদিহি দাবি করছেন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম, বেকারত্ব এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য সরকার দায় এড়াতে পারে না। ফলে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী চলে এসেছেন।

স্বতঃস্ফূর্ত যুব আন্দোলন : পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আন্দোলনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হলেও এখন এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত যুব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তরুণরা নিজেদের উদ্যোগে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে আন্দোলন দমন করা সরকারের জন্য আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিরোধী দলগুলোর একাত্মতা : কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী সরকারের কাছে একাধিক দাবি উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, পুলিশি হামলার তদন্ত এবং সংসদে শিক্ষা সংকট নিয়ে আলোচনা অন্যতম। বিভিন্ন বিরোধী নেতাও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন।

বিদেশেও সংহতির কর্মসূচি : আন্দোলনের প্রভাব ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে। বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।

শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া : শিক্ষামন্ত্রী প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ সম্পর্কে সচেতন এবং শিক্ষা সংস্কারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তার পদত্যাগের দাবিতে সরকার কিংবা শাসক দল কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই অবস্থান শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি দলের আস্থারই প্রতিফলন।

প্রশ্নের মুখে পুলিশি অভিযান : আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে পুলিশ। অনেক শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, আটক করার সময় তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পরও বহু আন্দোলনকারী আবার সরাসরি বিক্ষোভস্থলে ফিরে গিয়ে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে পুলিশি কঠোরতা আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ নয়; এটি দীর্ঘদিনের শিক্ষা সংকট, বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি তরুণদের ক্রমবর্ধমান হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, যদি দ্রুত কার্যকর সংস্কার এবং বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের সাম্প্রতিক এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক প্রশ্নে তরুণ সমাজ আর নীরব থাকতে রাজি নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ আজ বৃহত্তর জনঅসন্তোষে রূপ নিয়েছে। সরকার, বিরোধী দল, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অবস্থান দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সরকারের উদ্যোগ, আলোচনার পরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর।