দেশের প্রথম ফ্রি ওয়াই-ফাই নগরী ছিল সিলেট। আর তা বাস্তবায়নে ব্যয় করা হয়েছিল কোটি কোটি টাকা। নগরীর ৬২টি এলাকার ১২৬টি পয়েন্টে চালু করা হয়েছিল ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা। ডিজিটাল সিলেট সিটি প্রকল্পের আওতায় এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সুফল ভোগ করতে পারেননি নগরবাসী। উল্টো কাগজের ডিজিটাল নগরী বাস্তবে অ্যানালগই রয়ে গেছে।
তথ্য-প্রমাণ অনুসারে, প্রকল্পটি চালুর পর কিছুদিন অনেক চেষ্টা করে কোথাও কোথাও কিঞ্চিৎ ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা মিললেও, তা বেশিদিন টেকেনি। কার্যত দীর্ঘদিন ধরেই পুরো প্রকল্প অচল। কোথাও কোথাও যন্ত্রপাতিও নেই, চুরি অথবা নষ্ট হয়েছে। সর্বশেষ, সিলেট সিটি করপোরেশনের ফাইলে জায়গা করে নিয়েছে এই প্রকল্প।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান প্রশাসন প্রকল্পটি আবার সচলের উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল সিলেট গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি বিপুল বাজেটের এই ফ্রি ওয়াই-ফাই প্রকল্প এভাবে দীর্ঘদিন অচল ও অকার্যকর থাকা দুঃখজনক। যারা এটি শুরু করেছিলেন এবং বন্ধ করেছিলেন, দায় তাদের। আমি জানি না। তবে যেহেতু নাগরিক সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সিসিককে সচল করা আমার প্রধান লক্ষ্য, তাই বিষয়টি আবার খতিয়ে দেখব। আমরা এটি আবার চালু করে দেব। কারিগরি জটিলতা ও বকেয়া বিলের সামগ্রিক চিত্র মূল্যায়ন চলছে। দ্রুত এই সেবা পুনঃপ্রবর্তনে কাজ শুরু হয়েছে।
উল্টো সুর অবশ্য সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকারের কণ্ঠে। ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধাকে অপব্যবহার করার সুযোগ থাকায় তা রোধে এ প্রকল্পে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। গণমাধ্যমকে রেজাই রাফিন বলেন, যে কেউ যেকোনো জোনে ওয়াই-ফাই অ্যাকসেস পেয়ে যেকোনো কিছু আপলোড করে ফেলতে পারে। কিন্তু এটি কেউ খুঁজে বের করতে পারবে না। ফলে এই সুবিধা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সিসিক সূত্র জানায়, ২০২০ সালের মার্চে আইসিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) বাস্তবায়নে সিলেটকে দেশের প্রথম ‘ওয়াই-ফাই সিটি’ বা ডিজিটাল নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই মহাউদ্যোগ শুরু হয়েছিল। সেবাটি চালুর সময় তৎকালীন কর্তৃপক্ষ বলেছিল, নগরীর নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোর চারদিকের অন্তত ১০০ মিটার এলাকার মধ্যে উচ্চগতির এই নেটওয়ার্ক নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে প্রতি সেকেন্ডে ১০ মেগাবাইট ব্যান্ডউইথ গতিতে প্রতিটি অ্যাকসেস পয়েন্টে একযোগে ৫০০ ব্যবহারকারী যুক্ত হতে পারবেন। যার মধ্যে অন্তত ১০০ থেকে ২০০ ব্যবহারকারী কোনো ঝামেলা ছাড়াই একযোগে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা পাবেন। অনাকাক্সিক্ষত বা অনৈতিক ব্যবহার রোধে এতে কঠোর ওয়েব ফিল্টারিংয়েরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যাতে ব্যবহারকারীরা কোনো ধরনের নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে না পারেন। সার্ভিসটি চালুর পর সাধারণ পথচারী ও সংকটগ্রস্ত মানুষের জন্য তা আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। ইউজার নেম (ঝঝওউ) ‘উরমরঃধষ ইধহমষধফবংয’ এবং পাসওয়ার্ড ‘ঔড়ু ইধহমষধ’ ব্যবহার করে অনেকে জরুরি মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আদান-প্রদানসহ ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয় কাজ সারতে পেরেছেন। কিন্তু চালুর কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবহারকারীদের দিক থেকে ধীরগতির সংযোগ, বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং সেবাপ্রাপ্তিতে চরম ভোগান্তির অভিযোগ উঠতে থাকে।
উদ্বোধনের পর প্রকল্পটি ২০২১ সালের মার্চ মাসে আইসিটি বিভাগ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও দৈনন্দিন পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব সিসিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে সিসিকের হাতে আসার পর থেকে তৈরি হয় প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা। এই বিস্তৃত ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রতি মাসে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডসহ (বিটিসিএল) সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারকে প্রায় ৭ লাখ টাকা বিল প্রদান করতে হতো। কিন্তু নিজস্ব বাজেটে অর্থায়নের চরম সংকট, স্থায়ী কোনো বিজ্ঞাপনী পৃষ্ঠপোষক বা ফান্ডিং পার্টনার না থাকা এবং নিয়মিত বিল পরিশোধ না করায় বিটিসিএলের কাছে সিসিকের বিপুল পরিমাণ বকেয়া জমে যায়। অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় এক পর্যায়ে সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় বন্দরবাজার ফুটওভার ব্রিজ, হাসান মার্কেট, ক্বিন ব্রিজের দুই প্রান্ত, সার্কিট হাউসের জালালাবাদ পার্ক, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, দরগা গেইট, চৌকিদেখি, সিলেট রেলওয়ে স্টেশন, কদমতলী বাস টার্মিনাল, হুমায়ুন রশীদ চত্বর, শাহজালাল উপশহরের রোজভিউ পয়েন্ট, টিলাগড় পয়েন্ট, শাহী ঈদগাহ, কুমারপাড়া, নাইওরপুল, মীরাবাজার, রায়নগর, সোবহানীঘাট, ধোপাদীঘিরপাড়, নয়াসড়ক, কাজীটুলা, সুবিদবাজার, মীরের ময়দান এবং রিকাবীবাজার জেলা স্টেডিয়াম, এমসি কলেজ ও সরকারি মদন মোহন কলেজের মতো অত্যন্ত জনাকীর্ণ এলাকার কোটি কোটি টাকার ওয়াই-ফাই ডিভাইসগুলো সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। দীর্ঘদিন খোলা স্থানে অযতœ-অবহেলায় পড়ে থাকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া এবং নগরীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ ও রাস্তা সম্প্রসারণের সময় ভূগর্ভস্থ বা ওভারহেড অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল কেটে যাওয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ের রাউটার ও প্রয়োজনীয় সব কারিগরি সরঞ্জাম ও ক্যাবল লাইন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, সিসিক কর্তৃপক্ষ এখন এই বন্ধ হয়ে যাওয়া ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা পুনরায় সচল করতে নতুন করে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। নিজস্ব ফান্ড থেকে প্রতি মাসে ৭ লাখ টাকার বিশাল অঙ্কের ইন্টারনেট বিল দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সিসিক এখন বিকল্প অর্থায়ন এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল বাস্তবায়নের দিকে হাঁটছে। যেখানে দেশের বড় বড় বেসরকারি টেলিকম অপারেটর বা আইএসপিগুলোকে পার্টনার বা স্পন্সর হিসেবে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সার্ভিসটিকে আর্থিক স্বাবলম্বিতা দিতে বিজ্ঞাপনী স্পন্সরশিপের একটি কৌশলগত নকশা তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা যখন ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে যাবেন, তখন স্ক্রিনে নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক স্পন্সরদের বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হবে এবং সেই বিজ্ঞাপন থেকে অর্জিত আয় দিয়েই ওয়াই-ফাইয়ের মাসিক ব্যান্ডউইথ ও বকেয়া বিল পরিশোধ করা হবে, ফলে সিসিকের তহবিলে অতিরিক্ত কোনো চাপ পড়বে না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সিসিকের একটি বিশেষ কারিগরি দল এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে বিস্তারিত জরিপ চালিয়ে বন্ধ থাকা রাউটার, ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবল ও সরঞ্জামগুলোর সার্বিক তালিকা তৈরি করে সেগুলো দ্রুত মেরামত এবং সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ১২৬ পয়েন্ট একসঙ্গে চালু না করে রেলওয়ে স্টেশন, কদমতলী বাস টার্মিনাল, প্রধান প্রধান কলেজ এবং জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজারের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চালু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর বাইরেও মূল প্রকল্পের বাইরে সম্প্রতি বিটিসিএলের নিজস্ব উদ্যোগে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভ্রমণরত যাত্রীদের সুবিধার্থে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ফ্রি ওয়াই-ফাই ও ফ্রি টেলিফোন সেবা চালু করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস জানান, সিসিকের ফান্ড কম। এটি ব্যয়বহুল হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণে সিসিক অর্থ ব্যয় করতে পারছে না।

