ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

কচ্ছপ গতিতে মেঘনা রক্ষা প্রকল্প

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর তীব্র স্রোত ও জোয়ারের পানির আঘাতে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও বহু বছরের পুরোনো স্থাপনা। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চলমান মেগা প্রকল্পের কাজে ধীরগতি এবং তদারকির ঘাটতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনার তীর সংরক্ষণে সরকারের নেওয়া বড় প্রকল্পের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চললেও অনেক এলাকায় এখনো কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। স্থানীয়দের দাবি, কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ অসমাপ্ত রেখেই এলাকা ছেড়ে গেছে। বিশেষ করে কমলনগর উপজেলার পাটারীরহাট এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন কোম্পানির প্রায় ৩০০ মিটার এলাকার কাজ এখনো শুরু হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ওই অংশ অরক্ষিত থাকায় আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

অন্যদিকে রামগতি উপজেলার ডব্লিউ-১১ ব্লকে নি¤œমানের বালু ও বড় আকৃতির পাথর ব্যবহার করে বাঁধ নির্মাণের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ টেকসই হবে না এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে মেঘনার জোয়ারের পানিতে কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, লরেন্স, ফলকন ও পাটারীর হাটসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক ফুট বেশি উচ্চতার জোয়ারের পানিতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর তেগাছিয়া বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কবরস্থান এবং স্থানীয়দের একমাত্র কাঠের সেতুটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থাপনা রক্ষায় সরকারি সহায়তা না পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন। স্থানীয়রা বাঁশ, চাটাই ও বালুর বস্তা দিয়ে অস্থায়ীভাবে নদীর ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া রঘুনাথপুর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনা পানি ঢুকে পড়েছে। চর আলগী ও চর বাদাম ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভুক্তভোগী আনোয়ার বলেন, ‘প্রতি বছরই জোয়ারের পানিতে আমাদের ডুবতে হয়। এবার পানির চাপ আরও বেশি। ইতোমধ্যে ঘরবাড়িতে পানি উঠে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ক্ষতি হবে।’

কমলনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবুল খায়ের বলেন, ‘পাটারীরহাট রাস্তার মাথায় ওয়েস্টার্ন কোম্পানির ৩০০ মিটার কাজ না হওয়ায় তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি উপজেলা মাসিক সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপকে জানানো হয়েছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবোর দুর্বল তদারকি ও সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পের কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। তারা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কাজ শেষ করা এবং প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদ-উজ-জামান খান বলেন, ‘মেঘনার তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে ভবিষ্যতে লোকালয়ে পানি প্রবেশের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।’ তিনি জানান, প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নদীভাঙনকবলিত রামগতি ও কমলনগরের বাসিন্দাদের দাবি, বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে শুধু প্রকল্পের অগ্রগতি নয়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।