ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

বেহাল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক

দিলীপ কুমার মণ্ডল, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

রাজধানী ঢাকা ও শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হওয়া বড় বড় খানাখন্দ, বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা, কাদামাটি ও ভাঙাচোরা অংশ প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকেরা। ফুটপাত না থাকায় দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারীরাও।

১৯৯৭ সালে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড চালুর আগে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কই ছিল দুই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগের পথ। লিংক রোড চালুর পর এই সড়কের গুরুত্ব কিছুটা কমলেও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পপণ্য পরিবহনে এটি অন্যতম ব্যস্ত রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে পাগলা শিল্পাঞ্চল, বিসিক শিল্পনগরী ও আশপাশের বিভিন্ন কারখানার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের অধিকাংশই এ সড়ক ব্যবহার করে। ফলে সংস্কারের অভাবে সড়কটির দুরবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার পোস্তগোলা থেকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের তোলারাম কলেজ মোড়, জামতলা, মাসদাইর কবরস্থান, পুলিশ লাইন, লোহার মার্কেট, বন বিভাগ, বিসিক সংযোগ সড়কসহ একাধিক স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে সড়ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বৃষ্টির সময় এসব গর্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চালকদের জন্য তা মরণফাঁদে পরিণত হয়। প্রায়ই মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে আবার ধ লোবালুতে একাকার হয়ে পড়ে পুরো সড়ক, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পঞ্চবটি থেকে পুলিশ লাইন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায়। এ অংশে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট লেগেই থাকে। অনেক সময় কয়েক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। যানজটের কারণে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং রোগীবাহী যানবাহনও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

পঞ্চবটি থেকে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ কলেজে যাতায়াতকারী চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পণ মজুমদার বলেন, ‘চাষাঢ়া থেকে পঞ্চবটির দূরত্ব মাত্র ১৫ মিনিটের হলেও যানজটের কারণে প্রায়ই এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। এই সুযোগে অটোরিকশাচালকেরা দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করেন।’

নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে ফতুল্লার একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত সাইফুল কবীর বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসে যেতে ও ফিরতে পুলিশ লাইন থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত যানজটে আটকে থাকতে হয়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে হেঁটে যেতে হয়। কিন্তু নিরাপদ ফুটপাত না থাকায় কাদা, ময়লা পানি ও ভাঙা রাস্তা মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।’

যানবাহনচালকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির কোনো টেকসই সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিনই তাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। পিকআপচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘পাগলা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় পিচ উঠে গেছে। বড় বড় গর্তের কারণে খুব ধীরে গাড়ি চালাতে হয়। রাস্তার পাশেও কাদা জমে থাকায় অনেক সময় চাকা আটকে যায়।’

অটোরিকশাচালক মো. সোহেল বলেন, ‘বৃষ্টি হলে গর্তগুলো পানিতে ভরে পুকুরের মতো হয়ে যায়। কোথায় গর্ত, কোথায় রাস্তাÑ বোঝার উপায় থাকে না। প্রায়ই গাড়ি উল্টে যায় বা বিকল হয়ে পড়ে। এতে যানজট আরও বেড়ে যায় এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।’

নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) আব্দুল করিম বলেন, শিল্পাঞ্চলের ভারী যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ এবং দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো একটি যানবাহন গর্তে আটকে গেলেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে অতিরিক্ত জনবল নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম জানান, সড়কের খানাখন্দ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যে জরুরি সংস্কারকাজ সম্পন্নের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পঞ্চবটি থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত মাত্র ৭০ থেকে ৮০ মিটার কাজ বাকি আছে। কাজ শেষ হওয়ার পরই পুরাতন সড়কের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার শুরু করা হবে। তিনি জানান, পোস্তগোলা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত পুরো সড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে পুরো প্রকল্প শেষ হতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহনচালক ও যাত্রীদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় না থেকে দ্রুত সড়কের খানাখন্দ মেরামত, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নিরাপদ ফুটপাত নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তাদের মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বর্তমান অবস্থা শুধু জনদুর্ভোগই নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।