বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মেয়েদের মানবাধিকার নিশ্চিত, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, পরিপুষ্টি, সুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু কী হবে সেই মেয়েদের দারিদ্র্যতার কারণে যাদের ভেঙে যায়, অথবা প্রান্তিক কোনো এলাকায় থাকার কারণে স্বপ্ন দেখাই তার জন্য বিলাসিতা।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রায় ২৯ শতাংশ কন্যাশিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। শিক্ষায়, গ্রামীণ কন্যাশিশুদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্নের হার মাত্র ২৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের কন্যাশিশুদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ব্র্যাকের ২০২৩ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্তরাঞ্চলের চরের মেয়েদের ৪২ শতাংশ বিদ্যালয় ত্যাগ করে ঘরে গিয়ে কাজ করে বা বাল্যবিবাহের শিকার হয়।
জাতিসংঘের ডড়ৎষফ ঋড়ড়ফ চৎড়মৎধসসব (২০২৪) জানায়, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কন্যাশিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, বিশেষ করে উপকূল ও পাহাড়ি এলাকায়।
পরিসংখ্যানটা দেখলে খুব ভালো মতোই বোঝা যায়, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মেয়েরা চাঁদে পৌঁছে যায় সেখানে বাংলাদেশের একজন গ্রামীণ মেয়ের শুধু টিকে থাকার জন্যই অনেক লড়াই করতে হয়। দরিদ্রতা ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসের কারণে আমাদের দেশের হাজারো কন্যাশিশু ও নারীরা প্রতিনিয়ত নিজের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব শিশুরা পাচ্ছে না পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, আবার কেউ কেউ সুযোগ পেলেও দরিদ্রতা তার কাছে যেন এক অভিশাপের নাম।
শহরের মেয়েদেরও অনেক অসুবিধা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কিন্তু গ্রামে যাদের বসবাস তাদের অবস্থা বেশিই করুণ। চলুন আগে জেনে নিই গ্রামের বসবাসকারী একজন মেয়ের জীবন কেমন হয়।
ধরা যাক, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের এক দিনমজুর পরিবারের মেয়ে আয়েশা। তার বাবা মৌসুমি কৃষিশ্রমিক, মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মী। পরিবারে পাঁচ ভাইবোন।
পরিবারে আর্থিক সংকটের কারণে আপাতত তার পড়াশোনা বন্ধ রয়েছেÑ যদিও তার ভাইয়ের পড়াশোনা চলমান। কারণ গ্রামীণ প্রচলিত ধারণা মতে, মেয়ে ‘পরের ঘরে’ চলে যাবে তাই তার ওপর-এর খরচের প্রয়োজন নেই। ফলে আয়েশাকে ক্লাস সেভেন-এইটেই স্কুল ছাড়তে হয়েছে।
স্কুলে না গেলেও আয়েশার কাজ কমে না। ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা করা, রান্না করা, দূরের পুকুর থেকে পানি আনা, গৃহস্থালি কাজ তার ওপর বর্তায়। কিন্তু পরিবারের কাছে তার এই কাজের কোনো দাম নেই। উল্টো সে এই পরিবারের বোঝা। তাই তাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে পারলেই তার পরিবারের শান্তি। এক্ষেত্রে আয়েশার কোনো মতামত গ্রহণযোগ্য নয়।
এটিই আয়েশার জীবন। এটি শুধু আয়েশার নয় বরং গ্রামীণ বেশিরভাগ মেয়ের প্রতিচ্ছবি। সব সমস্যার মূল এখানেই।
আয়েশা প্রথমেই তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। তারপর বাল্যবিবাহের কারণে কম বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকির শিকার হলো। এই চক্র যেন চলতেই থাকে। প্রথমে দারিদ্র্য, পরবর্তীতে শিক্ষা বঞ্চনা, বাল্যবিবাহ, কম বয়সে মাতৃত্ব, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অদক্ষতা-পরবর্তী প্রজন্মেও একই দারিদ্র্যের পুনরাবৃত্তি।
এই চক্রের কারণে হাজারো মেয়ে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। দরিদ্র তাদের ওপর এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপর যেন অভিশাপের মতো তাড়া করছে।
এসব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতি বছর সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার জোরদার প্রচেষ্টা, সবারই খেয়াল রাখতে হবে, উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প যেন শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ না থাকে বরং ছড়িয়ে যায় ওই প্রান্তিক প্রান্তরে। এ ছাড়াও প্রান্তিক এলাকার দরিদ্র শিশুদের নিয়মিত ভাতা প্রদান, খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে যাতে অন্তত তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়।
সমাজ মানে সবার একসঙ্গে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নাম। আর একবিংশ শতাব্দীতে এসে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালন করতে গিয়ে আমরা যখন নারী ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতার কথা বলি, তারই অপরদিকে সমাজের একদল হয়তো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত থেকে যায়। তাই এক্ষেত্রে সকলের বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন।

