টানা বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীর ওপর নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বেইলি ব্রিজ সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। এই আকস্মিক দুর্যোগের ফলে নদীর দুপাড়ের অন্তত ১৫ হাজার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। গ্রামীণ জনপদের এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, স্থানীয় কৃষক এবং নিত্যদিনের পথচারীরা।
গত সোমবার দুপুরে উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের নয়াপাড়া দক্ষিণ সন্ন্যাসীভিটা এলাকায় চেল্লাখালী নদীতে ব্রিজ ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাহাড়ি ঢলের পানির অস্বাভাবিক চাপ ও প্রবল স্রোত সহ্য করতে না পেরে বেইলি ব্রিজটি মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ব্রিজ পার হওয়ার সময় শিশুসহ কয়েকজন ব্যক্তি পানির তোড়ে নদীতে পড়ে যান। তবে স্থানীয়দের সাহসিকতায় তারা সাঁতরে কূলে উঠতে সক্ষম হওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানান, বেইলি ব্রিজটি ছিল দুপাড়ের প্রায় ১৫ হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র প্রধান ভরসা। ব্রিজটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত কৃষিজমিতে যাতায়াত করতে পারছেন না কৃষকরা। বিকল্প কোনো সড়ক বা সেতু না থাকায় শিশু, নারী ও বয়স্কদেরও যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষক মো. হাবিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের আবাদি জমি নদীর ওপারে। আগে সহজে গিয়ে সার-কীটনাশক দিতে পারতাম। এখন ব্রিজ না থাকায় কয়েক কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা আমাদের কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বলে, আমাদের স্কুল নদীর ওপারে। ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন লম্বা পথ ঘুরে ক্লাসে যেতে হয়। অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আরেক ভুক্তভোগী বয়স্ক নারী ফাতেমা বেগম বলেন, জরুরি প্রয়োজনে ওপারে ডাক্তারের কাছে বা বাজারে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। একটা মাত্র নৌকা দিলেও তাতে পার হওয়া খুব ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের মতো বয়স্ক ও শিশুদের জন্য।
এদিকে নদীর পানি কিছুটা কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এলেও মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে একটি নৌকা চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে নদী পারাপারে এই সাময়িক ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের দাবি, গ্রামীণ জনপদের এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এলাকার অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে বেইলি ব্রিজটি পুনর্নির্মাণ বা বিকল্প সেতু স্থাপন করে জনদুর্ভোগ স্থায়ীভাবে নিরসন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক জানান, নদীর পানি এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেইলি ব্রিজটি দ্রুত সংস্কার কিংবা জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে স্থায়ী বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

