কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে নদ-নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত এক মাসে দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধর নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় তিন শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আকস্মিক এই ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন শত শত মানুষ। বসতভিটা হারিয়ে অনেকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, আর যারা এখনো টিকে আছেন, তারা চরম উৎকণ্ঠা ও অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির পর নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুধকুমার নদের ভাঙনে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কুটিরচরে ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া, আব্দুল খালেক, ফজু মিয়া, গাজী মিয়াসহ প্রায় ৬০ জনের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এর মধ্যে বাড়ি ও সর্বস্ব হারানোর শোকে সম্প্রতি মারা গেছেন হতভাগ্য গাজী মিয়া।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া জানান, যেভাবে দুধকুমার নদ ভাঙছে, তাতে অল্প সময়ের মধ্যে ওই ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ভাঙন রোধে মানববন্ধনের পর পানি উন্নয়ন বোর্ড কেবল এক হাজার বালির বস্তা ফেলেছিল, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে ভাঙন থামেনি, বরং চর লুছনী ও গোয়ালটারী এলাকায় তা আরও বেড়েছে।
একই অবস্থা রায়গঞ্জ ইউনিয়নেও। গত ১৫ দিনে চর দামালগ্রাম ও বীর দামালগ্রামের জাহেদ আলী, মতিয়ার রহমান, ফরিদুল ইসলামসহ প্রায় ৭০টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এ ছাড়া গত চার দিন আগে পাঁচমাথাঘাট সড়কটিও সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ইউনিয়নের হাজিরমোড় ও মোল্লারভিটার বাসিন্দারাও রাত্রীযাপন করছেন চরম আতঙ্ক নিয়ে। স্বামীহারা মজিরন বেগম ও আছমা বেগমের মতো অসহায় মানুষগুলো তাদের মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় আকুল আবেদন জানিয়েছেন। নুনখাওয়া ইউনিয়নের ফকিরগঞ্জ ও ব্যাপারীরচরেও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন অন্তত ৬০টি পরিবার।
মোল্লারভিটার বাসিন্দা মজিরন বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। নদীর ধারে রাস্তার পাশে ছোট এক টুকরো জমিতে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়েছিলাম। যেভাবে নদী ভাঙছে, তাতে আমার এই শেষ সম্বলটুকু যেকোনো মুহূর্তে নদীর পেটে চলে যাবে। তখন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো, কার কাছে যাবÑ এই চিন্তায় রাতে আমার চোখে আর ঘুম আসে না।’
চর লুছনীর বাসিন্দা শাহালম মিয়া জানান, ‘দুধকুমার নদ একে একে আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। আমার ঘরবাড়ি বারবার ভেঙেছে, আজ আমি সম্পূর্ণ নিঃস্ব। এখানে শুধু আমাদের বসতভিটেই নয়, একটি পাকা সড়ক, মসজিদ ও মাদ্রাসাও এখন ভাঙনের মুখে রয়েছে। প্রশাসন বা পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি দ্রুত কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়, তবে অচিরেই এখানকার শত শত মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পথে বসবে।’
এদিকে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধর নদীর ভাঙনে নারায়ণপুর ইউনিয়নের চৌদ্দঘুরি, পূর্ব ও পশ্চিম বালারহাট, কন্যামতি, বালারহাট বাজার, মহসিনের চর এবং পদ্মারচর এলাকায় গত এক মাসে দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বালারহাট বাজার মসজিদটি।
নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফিজুর রহমান জানান, বছরের একটি বড় সময়জুড়ে নদীভাঙন চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার জানিয়েও স্থায়ী কোনো সুফল মেলেনি। পাউবোর ফেলা কিছু বালির বস্তা দিয়ে ভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোফাখখারুল ইসলাম জানান, নদীভাঙন কবলিত মানুষদের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ঢেউটিন, গৃহনির্মাণ বাবদ অর্থ ও শুকনো খাবারের আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত তা বিতরণ করা হবে।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলার ৩৮টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে বামনডাঙ্গা ও রায়গঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই এলাকাগুলো ঘুরে পাউবোকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে চারবার আবেদন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

