একটি রাষ্ট্রে দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমেই হয় না। মাঝে মধ্যে এমন নীতিও দুর্নীতিতে রূপ নেয়, যার মাধ্যমে বছরের পর বছর জনগণের অর্থ একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের ইতিহাস ঠিক তেমনই এক রাষ্ট্রীয় বৈধতার আড়ালে সংঘটিত লুটপাটের নির্মম দলিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ, বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন আত্মঘাতী ব্যবস্থা এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পেরেছে। আর তার মূল্য দিচ্ছে দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ, বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, বাড়তি ভর্তুকি, বাজেট ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সংকোচনের মাধ্যমে।
বুধবার রূপালী বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মাত্র ১৪ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে এক লাখ চার হাজার কোটিরও বেশি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ। বিভিন্ন দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বারবার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, আর বিশেষ আইনের আড়ালে টেন্ডারবিহীন চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি এসব অভিযোগের সামান্য অংশও সত্য হয়, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ, তখন কেন এখনো অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা গুনতে হবে? কেন জনগণ এমন বিদ্যুতের মূল্য দেবে, যা কখনো উৎপাদিতই হয়নি?
সরকার অবশ্য বলছে, বিশেষ আইন বাতিল করা হলেও আগের চুক্তিগুলো বহাল থাকায় এখনো ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
এটি বাস্তবতা হতে পারে, কিন্তু এটিই শেষ কথা হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি শুধু অতীতের দায়ের কথা বলে দায়মুক্তি খোঁজে, তবে জনগণের কাছে তার জবাবদিহি কোথায়? একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব শুধু অতীতের অনিয়ম তুলে ধরা নয়; বরং সেই অনিয়মের আর্থিক ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, তার কার্যকর পথ বের করা।
আমরা মনে করি, এখন প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। বিদ্যুৎ খাতের গত দেড় দশকের প্রতিটি বড় চুক্তির ফরেনসিক অডিট করতে হবে এবং সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। যেসব চুক্তিতে রাষ্ট্রের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পুনঃআলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জনির্ভর বিদ্যুৎ ক্রয় মডেল থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে। পাশাপাশি অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচার এবং প্রয়োজনে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য আইনগত সুরক্ষা গড়ে তোলা জরুরি। কোনো সরকার যেন আর বিশেষ আইন বা নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেন্ডারবিহীন শত শত কোটি টাকার চুক্তি করতে না পারে, সে জন্য সংসদীয় নজরদারি, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বাধ্যতামূলক জনস্বার্থ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যুৎ খাতকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মুনাফার ক্ষেত্র নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অভিযোগ অস্বীকার করার অধিকার সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অবশ্যই আছে, এবং আইনের চোখে প্রত্যেকেই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ। তবে অভিযোগের গুরুত্ব এতটাই বড় যে, তা ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই। জনগণের অর্থ কোথায় গেল, কারা লাভবান হলো, কারা সিদ্ধান্ত নিল এবং রাষ্ট্রের এই বিপুল ক্ষতির দায় কার, এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর জাতি জানতে চায়।
বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং জ্বালানি নিরাপত্তার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এই সময়ে অতীতের ভুল নীতির বোঝা টেনে নিয়ে চলা বিলাসিতা নয়, আত্মঘাতিতা। সরকার যদি সত্যিই বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার চায়, তাহলে কেবল পুরোনো সরকারের সমালোচনা করলেই চলবে না, অপচয়ের এই দুষ্টচক্র ভেঙে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ জনগণ আর অন্ধকারের নামে চলা লুটপাটের জন্য মূল্য দিতে রাজি নয়।

