রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংগঠন শক্তিশালী করতে দেশজুড়ে পুনর্গঠন ও দল গোছানোর কাজ জোরদার করেছে বিএনপি। তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোকে গতিশীল করতে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি নিজেদের সাংগঠনিক ভাবমূর্তি আরও সুসংহত করছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে চরম সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি বিতর্কিত ও আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নতুন করে প্রবল ধাক্কা খেলো দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের নৈতিক স্খলনজনিত কা- স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে জামায়াতের আদর্শিক অবস্থান ও দলের ক্লিন ইমেজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভিডিও কা-কে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচনা, স্থানীয় কর্মীদের হতাশা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তীব্র চাপে পড়ে জামায়াত এখন ব্যাপক সাংগঠনিক ক্ষতির মুখে। একদিকে বিএনপি যখন ক্ষমতার দায়িত্ব পালনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দল পুনর্গঠনে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাচ্ছে, অন্যদিকে একের পর এক কেলেঙ্কারি ও সংকটে দিশাহারা হয়ে জামায়াত ক্রমাগত রাজনৈতিক ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছে।
রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণ ও কৌশলগত পরিবর্তন স্পষ্ট : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনীতির মাঠে আবার এক নতুন মেরূকরণ ও কৌশলগত পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুই শরিক বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে বছরের পর বছর মামলা-হামলা, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও কারাবাস, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক জটিলতায় সাংগঠনিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জামায়াতে ইসলামী নিজেদের তৃণমূল পুনর্গঠনে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, জাতীয় রাজনীতি ও সম্ভাব্য ক্ষমতার মসনদে অবস্থান পোক্ত রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দল পুনর্গঠনের দ্বিমুখী দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের ধাক্কা দুই দলকেই সইতে হলেও জামায়াতের ওপর আসা প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি আঘাত ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি সুদূরপ্রসারী। অন্যদিকে বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজপথের আন্দোলন ধরে রেখে একদিকে যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার পলিসি তৈরি ও সংস্কার প্রস্তাবনা দিচ্ছে, অন্যদিকে দলের ভেতরে অনুপ্রবেশ রোধ ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সাংগঠনিক পুনর্গঠন জোরদার করছে।
জামায়াতের সাংগঠনিক ক্ষত ও ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম : বিগত সরকারের সময় শীর্ষ সারির প্রায় সব নেতাকে হারানো, নিবন্ধন বাতিল ও কার্যালয় সিলগালা থাকার কারণে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বর্তমানে আইনি লড়াই ও প্রকাশ্যে কার্যক্রমের সুযোগ মিললেও জনবল চাঙা করা এবং অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ রাখাই দলটির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির দ্বিবিধ চ্যালেঞ্জ, রাষ্ট্রভাবনা ও দল সামলানো : রাষ্ট্র পরিচালনায় সংস্কারের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিএনপিকে দেশজুড়ে নিজেদের দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীদের অতি-উৎসাহ দমন এবং যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের কাজ চলছে সমান্তরালভাবে।
জোটের নতুন রসায়ন ও দূরত্ব : রাজনৈতিক সমীকরণে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে আদর্শগত ও কৌশলগত ব্যবধান এখন বেশ স্পষ্ট। দল দুটি এখন নিজস্ব ধারায় সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে।
তরুণ প্রজন্ম ও নতুন ধারার রাজনীতি : উভয় দলকেই এখন ৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে এগোতে হচ্ছে, যা পুরোনো ধারার সাংগঠনিক স্টাইলের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন। এই বিষয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার বিগত ১৫ বছর ধরে আমাদের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আমাদের শীর্ষ নেতাদের অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, তরুণ কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে এবং আমাদের অফিসগুলো বন্ধ রেখে দলটিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। আমরা সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিÑ এ কথা সত্য। তবে জামায়াত শাহাদাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আন্দোলন। আমাদের মূল শক্তি আমাদের ঈমানি ভিত্তি ও ত্যাগের মানসিকতা। দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আমরা আইনি অধিকার ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রতিটা ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে তরুণদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের সংগঠনকে পুনর্গঠন করছি। ইনশাআল্লাহ, কোনো ষড়যন্ত্রই সত্য ও ন্যায়ের এই পথচলাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না।’
জানতে চাইলে জামায়াতের মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘আমাদের নিবন্ধন বাতিল ও নিষিদ্ধ করার পেছনে বিগত সরকারের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আমাদের রুট লেভেলের শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া। বহু নেতাকর্মী বছরের পর বছর গৃহহীন ছিলেন, অনেকে কারাবরণ করেছেন। ফলে সাংগঠনিক যে ক্ষতি আমাদের হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে আমরা নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জামায়াত সবসময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে এবং আগামীতে যেকোনো বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে আমরা কাজ করে যাব।’
রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা বাস্তবায়ন এবং একই সঙ্গে দল গুছিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপি একটি গণমানুষের দল। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর লাখ লাখ মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, হাজারো নেতাকর্মীকে গুম ও খুন করা হয়েছে। এত কিছুর পরও বিএনপিকে ভেঙে ফেলা যায়নি, বরং বিএনপি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এসেছে। আমরা এখন একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার পরিচালনা ও পলিসি নির্ধারণে গঠনমূলক অবদান রাখছি, অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নজর রাখছি যেন কেউ অন্যায় বা অসংগঠিত কাজের সুযোগ না পায়। দলকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সারা দেশে পুনর্গঠন কাজ জোরালোভাবে এগিয়ে চলছে।’
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘বর্তমানে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের পর মানুষ একটি সুশাসিত এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়। বিএনপি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রমাণ করেছে যে, আমরা রাষ্ট্র পরিচালনাতেও যেমন দক্ষ, রাজনীতিতেও তেমনই গণমুখী। আমাদের মূল অগ্রাধিকার হলো দলকে তৃণমূল থেকে আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোতে সাজানো। যোগ্য, ত্যাগী ও শিক্ষিত তরুণ নেতৃত্বকে দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্য আমাদের কাউন্সিল ও কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’

