চলতি মাসেই হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত তিন কোম্পানির তৈরি ১০ ধরনের করোনারি স্টেন্ট বা হার্টের রিংয়ের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব কোম্পানির স্টেন্টের দাম ৩ হাজার থেকে ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমার কথা রয়েছে। করোনারি স্টেন্টের দাম কমানোর বিষয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটির সুপারিশের পরই এ সিদ্ধান্ত নেয় সরকার, যা আগামী অক্টোবর মাস থেকে কার্যকর হবে। কিন্তু দাম কমলেও সাধারণ রোগীরা এর সুবিধা কতটা পাবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
হৃদরোগের চিকিৎসায় এটি অপরিহার্য হলেও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় স্টেন্ট ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল বাণিজ্য। মূলত আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর, হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘সাপ্লাই-চেইন বাণিজ্যের’ কারণে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধে বাধ্য হচ্ছেন রোগী।
দেশের চাহিদা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
জানা যায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার স্টেন্ট প্রতিস্থাপন হয়, যার অধিকাংশই আসে ভারত, চীন, ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে। সরকারি ক্রয়ে এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড কিছু আমদানি করে সরকারি হাসপাতালগুলোয় দিয়ে থাকে। তবে এর তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে এর ব্যবহার বেশি। আমদানির সময় একেক স্টেন্টের ড্রাগ-ইলুটিং স্টেন্টের (ডিইএস) মূল্য গড়ে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা হলেও রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো। বার মেটাল স্টেন্টের (বিএমএস) ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রায় ৩৪ গুণ বেশি দাম রাখা হয়।
আর এর পেছনে রয়েছে ডাক্তার-হাসপাতাল কমিশন সিন্ডিকেট। স্টেন্ট সরবরাহকারীরা ডাক্তার ও হাসপাতালকে কমিশন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ব্যবহারে বাধ্য করে। এতে রোগীকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা দামি স্টেন্ট পরানো হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ স্টেন্ট ব্যবহারেরও অভিযোগ পাওয়া যায়। ব্যবহৃত স্টেন্ট পুনঃপ্যাকেজিং করে ব্যবহারের অভিযোগ অহরহ। এ ছাড়া নকল চীনা বা কম মানের স্টেন্টও দেওয়া হচ্ছে রোগীদের।
সরকার নির্ধারিত নতুন দাম
ধমনীতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া সচল রাখতে এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে স্টেন্ট বা করোনারি স্টেন্ট পরানো হয়। প্রচলিত ভাষায় এটি ‘রিং’ হিসেবে পরিচিত। সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আগামী অক্টোবর থেকে মেডট্রোনিকের তৈরি রিসলিউট অনিক্সের স্টেন্টের দাম ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার টাকা করে বিক্রি করা হবে।
একই কোম্পানির অনিক্স ট্রুকরের দাম ৭২ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে। বস্টন সায়েন্টিফিকের প্রোমাস এলিটের দাম ৭৯ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৭২ হাজার টাকায় বিক্রি হবে। প্রোমাস প্রিমিয়ার স্টেন্ট ৭৩ হাজার টাকার বদলে ৭০ হাজার, সাইনার্জির দাম ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার, সাইনার্জি শিল্ড ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা এবং সাইনার্জি এক্সডি ১ লাখ ৮৮ হাজার থেকে কমিয়ে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া অ্যাবোটের জায়েন্স প্রাইম স্টেন্টের দাম ৬৬ হাজার ৬০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা, জায়েন্স আলপাইনের দাম ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার টাকা এবং জায়েন্স সিয়েরার দাম ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা রয়েছে। সর্বোপরি সরকারনির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন হলে স্টেন্টের দাম হবে সর্বনিন্ম ৫০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা। স্টেন্টভেদে দাম কমছে ১০ থেকে ৫০ হাজার বা ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বলেছে, হাসপাতালগুলো যেন এসব স্টেন্টের নির্ধারিত দামের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৫ শতাংশের বেশি টাকা না নিতে পারে, সে বিষয়টি তদারক করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া অনুমোদিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের বাইরে কোনো কার্ডিওভাসকুলার ও নিউরো ইমপ্ল্যান্ট ডিভাইস যেন না কেনা হয়, সেদিকে নজরদারি করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও বলা হয় প্রজ্ঞাপনে। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বিপত্তি। দেশের সব সরকারি হাসপাতালে নজরদারি করার মতো জনবল সরকারের নেই। আর এই সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক মিলে তৈরি করেছেন ‘হার্টের রিং সিন্ডিকেট’। রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো কোম্পানির রিং উচ্চমূল্যে কিনতে বাধ্য করছে তারা। এদের মধ্যে মাত্র কয়েকটি কোম্পানি নিয়ম মেনে বাজারে স্টেন্ট সরবরাহ করছে।
পরিসংখ্যান যা বলছে
বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনের তথ্যমতে, দেশের অন্তত ৮৯টি ক্যাথল্যাব সেন্টারে স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়, যার প্রায় অধিকাংশই সরকারি। তবে সবচেয়ে বেশি এই চিকিৎসা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিউট, হার্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বারডেম কার্ডিয়াক সেন্টারসহ আরও কয়েকটি হাসপাতালে। ঢাকার বাইরে সবেচেয় বেশি স্টেন্ট পরানো হয় চট্টগ্রামে। সেখানে অন্তত ১০টি হাসপাতালে স্টেন্ট পরানো হয়। এ ছাড়া সিলেট, দিনাজপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও কুমিল্লায় একটি বা দুটি করে হাসপাতালে এই চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনের এক পরিসংখ্যান বলছে, বছরে দেশে ৩০ হাজারের কিছু বেশি রোগীর শরীরে স্টেন্ট বসানো হয়। সেই হিসাবে দেশে দৈনিক ৮২ থেকে ৮৫ জনের শরীরে স্টেন্ট লাগানো হয়। যদি এটি বিনা মূল্যে সরবরাহ করা যায়, তাহলে রোগীরা তো উপকৃত হবেই। কমবে ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যও।
সরকার নির্ধারিত সর্বশেষ দাম অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে অ্যাবোট ভাসকুলার, বোস্টন সায়েন্টিফিক ও মেডেট্রোনিক নামের যুক্তরাষ্ট্রে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের স্টেন্ট। যার সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। একই দেশের আরেকটি স্টেন্ট বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৬ হাজার ৬০০ টাকায়। সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে জাপানের তৈরি স্টেন্ট মাত্র ১৪ হাজার টাকায়।
এই মূল্যের সঙ্গে বাৎসরিক চাহিদার তুলনা করলে দেখা যায়, যদি ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকার স্টেন্টটি রোগীদের দিতে হয়, তাহলে প্রয়োজন ৪২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একইভাবে যদি ৬৬ হাজার ৬০০ টাকার স্টেন্টটি রোগীদের দিতে হয়, তাহলে প্রয়োজন ২৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর যদি ১৪ হাজার টাকার স্টেন্টটি দিতে হয়, তাহলে প্রয়োজন মাত্র ৪২ কোটি টাকা।
আমদানিকারকদের বক্তব্য
এসব বিষয়ে মেডিকেল ডিভাইস আমদানিকারক সমিতির সভাপতি ওয়াসিম আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, গত বছর যখন সরকার দাম নির্ধারণ করে, আমরা চেয়েছিলাম দাম নির্ধারণ সবার জন্য সমান হোক। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় আমরা হাইকোর্টেও গিয়েছিলাম। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিষয়টি দেখবে বলে আমরা রিট আবেদন প্রত্যাহার করেছি। এখনো চাই সবাই সরকারনির্ধারিত দামে স্টেন্ট পাক।
যদিও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে, রোগীদের স্বার্থেই এমন সিদ্ধান্তে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একেক কোম্পানির একেক রকম নতুন দাম নির্ধারণের ফলে বেঁকে বসতে পারেন ব্যবসায়ীরা, যা গত বছর ঘটেছিল। তখন ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর অজুহাতে আমদানি বন্ধ করে দেয়। এবারও একই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতেই দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঔষধ প্রশসান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শামীম হায়দার।
তিনি বলেন, ‘এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতেই গত বছর থেকে দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি অসাধু উপায়ে রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে এবং আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আসে, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমদানিকারকদের সহযোগিতা চেয়েছি, যাতে স্টেন্টের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। আলোচনার দরজা সব সময় খোলা। তারা চাইলে নতুন প্রস্তাব পাঠাতে পারে।’
এ ছাড়া স্টেন্টের দাম নির্ধারণে অসমতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডিজিডিএ সরাসরি মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল না। একটি কমিটি, যেখানে পরিচিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা ছিলেন, তারা প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। কারো আপত্তি থাকলে তারা আমাদের জানাতে পারে, আমরা কমিটির কাছে তুলে ধরব।’
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো.আকতার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আপাতত তিন কোম্পানির ১০ ধরনের হার্টের রিংয়ের দাম কমবে। এসব রিংয়ের দাম অনেক বেশি ছিল। পর্যায়ক্রমে বাকি কোম্পানিগুলোর রিংয়ের দাম কমাবে মূল্য নির্ধারণ কমিটি।
যা বলছে বেসরকারি হাসপাতাল
নিয়মিত ইনভয়েসে দাম পরিবর্তনের অভিযোগ পাওয়া গেলেও নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন বেসরকারি হাসপাতালের মালিকেরা। তারা বলছেন, ঔষধ প্রশাস অধিদপ্তরের নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে স্টেন্ট। এখানে দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ নেই।
রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা আগে কেনা স্টেন্টগুলো নতুন দামে ব্যবহার করছি, কারণ আমদানিকারকেরা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নির্ধারিত দামে সরবরাহ করছে না। আমাদের স্টক কিছুদিন পর্যাপ্ত আছে। নতুন দাম কার্যকর হলে নতুন দামে বিক্রি হবে। আমদানিকারকেরা ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে স্টেন্ট সরবরাহ না করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।’
এ বিষয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার আবু রায়হান আল বিরুনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেক রোগী নিজেদের পছন্দের ব্র্যান্ড অনুযায়ী স্টেন্ট ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে দামের বিষয়ে আমাদের কিছু করার থাকে না। রোগীরা নিজেরাই এসব কিনে নিয়ে আসে। এগুলো আজ থেকে ১০-১২ বছর আগে ঘটত। যখন সরকারনির্ধারিত দাম ছিলো না। এখন তো ইন্টারনেটের যুগ। কোনো সুযোগ নেই বাড়তি দাম রাখার।’
একই কথা বলেন রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ চক্রবর্তী।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এমনটা করার কোনো সুযোগই নেই। প্রত্যেক রোগীই দাম অনুযায়ী স্টেন্ট বাছাই করেন। তবে এরকমটা যদি ঘটে থাকে, তাহলে অবশ্যই এটি অপরাধ। অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা উচিত।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেস বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রায়ই অভিযোগ আসে, ইনভয়েস বদলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। সরকারনির্ধারিত দাম সবারই মানা উচিত বলে আমি মনে করি।’
সরকার চাইলে বিনা মূল্যে সব রোগীকে স্টেন্ট সরবরাহ সম্ভব
স্বাস্থ্য খাতে ২০২৩-২৪-এর বাজেটে মোট বরাদ্দ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। এর থেকে যদি সর্বোচ্চ দামের রিংটিও বিনা মূল্যে রোগীদের দিতে হয়, তাহলে বছরে মাত্র ৪২৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে জানিয়ে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাজল কর্মকার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘হৃদরোগ ইনস্টিউটসহ অধিকাংশ হাসপাতালেই প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসেন হার্টের চিকিৎসা নিতে। অনেকেই একের অধিক ব্লক নিয়ে আসেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের রিং বসাতেই হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বজনেরা আর্থিক অনটনের কারণে চিকিৎসা না করেই ফিরে যান। এ অবস্থায় মানুষের জীবন রক্ষায় এই স্টেন্টটি সরকার চাইলেই বিনা মূল্যে সরবরাহ করতে পারে। এতে করে ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য যেমন কমবে, তেমনি রোগীদেরও উপকার হবে।’
দেশে ৫০ শতাংশ হার্টের রিং (স্টেন্ট) সরবরাহ করে ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠান। বাকি ৫০ শতাংশ আসে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। গত বছরের শেষে রোগীদের স্বার্থে সব ধরনের হার্টের রিংয়ের দাম কমানোর ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু তখনই বাঁধে বিপত্তি। ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয় রিং সরবরাহ। এতে করে শুধু আমেরিকান স্টেন্ট দিয়ে হৃদরোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসকদের। এমনকি দাম বাড়ানোর জন্য ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতের দ্বারস্থ পর্যন্ত হয়। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই সাড়ে তিন মাসের মাথায় চলতি বছরের শুরুতে হৃদরোগীদের চিকিৎসায় জরুরি এই রিংয়ের দাম আবারও বাড়ায় সরকার। এর ফলে প্রতিটি স্টেন্ট কিনতে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে রোগীদের, যা সার্বিক চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। সম্প্রতি আবারও গুটি কয়েক কোম্পানির রিংয়ের দাম কমানোর ঘোষণায় নতুন করে এই বিড়ম্বনা তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্টেন্ট বাণিজ্যের সুযোগ নেই: হৃদরোগ পরিচালক
নিয়মিত অভিযোগ থাকলেও নিজের হাসপাতালে স্টেন্ট নিয়ে বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ওয়াদুদ চৌধুরী।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘সরকারনির্ধারিত দামের চাইতে এক টাকা বেশি দামে স্টেন্ট রোগীকে কিনতে হয় এমন কোনো সুযোগ এখানে নেই। আমাদের চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের আগে স্টেন্টের ইনভয়েস রোগীর স্বজনকে দেখিয়ে নেন। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো সিন্ডিকেটের প্রমাণ কেউ দিতে পারে, তাহলে আমরা অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, হৃদরোগ ইনস্টিউটসহ দেশের সব হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে করোনারি স্টেন্টের নতুন মূল্যতালিকা প্রদর্শন করে রাখা হবে বলে জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
হাসপাতালগুলো অধিকাংশ সময় রোগীর স্বজনদের ইনভয়েস দেখায় না উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের যখন ক্যারিয়ার শুরু হয়, তখনই বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, এমনকি সরকারি হাসপাতাল থেকেও এমন অভিযোগ পেতাম। মূল অভিযোগ ছিল স্টেন্টের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ইউআইএন) রোগীকে না দিয়ে গোপন রাখা হয়। ফলে রোগীর স্বজনেরা কিছুই বুঝতে পারেন না। এই ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ইউআইএন না দেখিয়েই ইচ্ছেমতো দাম আদায় করেন ব্যবসায়ীরা। ডাক্তার যখন লিখে দেয় একটি কোম্পানির কথা, সেখানে তো রোগী কিনতে বাধ্য। বিষয়টি শক্ত হাতে তদারক করা প্রয়োজন।’
একই কথা বলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘হার্টের রিং মানুষের জীবন বাঁচানোর অন্যতম একটি চিকিৎসাসামগ্রী। বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সরকার যেহেতু দাম নির্ধারণ করেই দিয়েছে, মনে করি সঠিক তদারকির প্রয়োজন এবার।’