ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হুয়াওয়ের টাকায় বিসিসির পাঁচ কর্মকর্তার চীন সফর

শাওন সোলায়মান
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ১২:৪৩ এএম
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ভবন।

ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টাকায় বিদেশ সফর নিষিদ্ধ করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেওয়া নির্দেশনা মানার বালাই নেই সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ পরিপত্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) ৫ কর্মকর্তার চীন সফর।

তারা হলেন-  বিসিসির পরিচালক (ডেটা সেন্টার) এস কে মফিজুর রহমান, প্রশাসক (ওয়েব) সুমন কুমার পাটোয়ারী, সহযোগী (নেটওয়ার্ক কমিউনিকেশন) আম্মার আশরাফ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (ফ্যাসিলিটিজ অপারেশন) মো. আতিকুর রহমান এবং সহযোগী (বিসিপি-ডিআর) সালমা সুবহা মালিহা।

এদের মাঝে সুমন কুমার পাটোয়ারী বিসিসির নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার বিভাগ আর বাকি চারজনই জাতীয় ডেটা সেন্টারের কর্মকর্তা। নির্দেশনা অমান্যে আমলাদের পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানেরও দায় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের উচিত বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। 

বিসিসির কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের সরকারি আদেশপত্র অনুযায়ী, গত ২ থেকে ৭ নভেম্বর চীনে আয়োজিত ‘হুয়াওয়ে ক্লাউড স্ট্যাক অ্যান্ড ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক’ অনুষ্ঠানের জন্য অনাপত্তিপত্র ইস্যু করা হয়। তবে এই অনুষ্ঠান ঘিরেও তৈরি হয়েছে আরেক বিতর্ক। আইসিটি বিভাগের প্রশাসন শাখার আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষরিত ওই আদেশপত্রে, অনুষ্ঠান আয়োজনের শহরের কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ চীনের কোন শহরের কোথায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের ৫ সরকারি কর্মকর্তা অংশ নেবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। উপরন্তু ইন্টারনেটে উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেও ওই তারিখে চীনে হুয়াওয়ে আয়োজিত এমন কোনো অনুষ্ঠানস্থলের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে, অনুষ্ঠানটি সরাসরি অংশগ্রহণে (ইন-পার্সন) আয়োজিত না হয়ে ‘অনলাইন’ মাধ্যমে আয়োজিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুষ্ঠানস্থল সম্পর্কে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে কিছুটা সময় নিয়ে বিসিসির পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, অনুষ্ঠানটি শেনজেনে (চীনের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র) সরাসরি অনুষ্ঠিত হয়। 

আইসিটি বিভাগ এবং বিসিসির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওই ৫ কর্মকর্তা হুয়াওয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চীনে গিয়েছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পরিচালক মজিফুর রহমানও। হুয়াওয়ের বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য ও সেবা বিসিসি এবং আইসিটি বিভাগ বিভিন্ন সময় ক্রয় করেছে। কখনো হুয়াওয়ে নিজেই বা স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে আইসিটি বিভাগ ও বিসিসিতে পণ্য ও সেবা সরবরাহ করেছে। সেই হিসেবে, হুয়াওয়ের অর্থায়নে বিসিসির কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর সরকারের নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

এই সফর থেকে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হবে বা বাংলাদেশের অর্জন কী- এমন প্রশ্নের জবাবে সফরকারীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানলাম, বুঝলাম। আমাদের ডিজিটালাইজেশনে এটা হেল্প করবে।’  তবে উল্লেখ্য যে, জাতীয় ডেটা সেন্টারের ক্লাউড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মের জন্য ‘হুয়াওয়ে ক্লাউড স্ট্যাক ৮.৫.১’ পণ্য কিনছে বিসিসির অধীন চলমান ‘এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি (এজ)’ প্রকল্প।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১৩ দফা নির্দেশনা দেয়। এসব নির্দেশনার মধ্যে আছে-বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা; বছরের সম্ভাব্য বিদেশ ভ্রমণের একটি তালিকা জানানো; বিদেশ ভ্রমণের জন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করা (প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এর কাঠামো তৈরি করে দেবে এবং এর তথ্য সংরক্ষণ করবে); সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের একাধারে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করা এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ও সচিবকে একসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ সাধারণভাবে পরিহার করতে হবে।

তবে জাতীয় স্বার্থে অনুরূপ ভ্রমণ একান্ত অপরিহার্য হলে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অধীন অধিদপ্তর বা সংস্থার প্রধানেরা একান্ত অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া একসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণে যাবেন না বলেও নির্দেশনায় জানানো হয়। এরপর চলতি বছরের মার্চে সরকার আবারও নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়, কোনো ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না। এরপর জুলাই মাসে সরকার আরেকটি নির্দেশনা দেয়। গত ২১ অক্টোবর আরেকটি পরিপত্র জারি করে উপদেষ্টার কার্যালয় বলেছে, অপরিহার্য কারণ ছাড়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না।

এতে আরও বলা হয়েছে, আগের জারীকৃত পরিপত্রের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা ঘটছে। তবে এত এত নির্দেশনাও হুয়াওয়ের টাকায় বিসিসি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ জন্য সরকারি আমলাদের পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায় নিতে হবে। কারণ উভয়ের যোগসাজসেই বিদেশ সফরের ঘটনা ঘটছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রলোভন দেখিয়ে প্রকল্পে বা ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিদেশ সফরকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যেমন- সচিব বা মহাপরিচালক (ডিজি) বা চেয়ারম্যানের মতো দপ্তরপ্রধানদের বিদেশ সফরে সরকারি আদেশ পেতে সেই কার্যালয়েরই অনুমোদন লাগে। তাহলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে যদি শুরুতেই বিদেশ সফরের আদেশ দেওয়া না হয়, তাহলেও তো সফরের সংখ্যা কমে যায়। আর দপ্তর প্রধানদের অধস্তন কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে, যারা নির্দেশনা অমান্য করে অনুমতি দিচ্ছেন, তাদের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানেরও দায় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

এদিকে কর্মকর্তাদের সফর সম্পর্কে বিসিসির নির্বাহী পরিচালক আবু সাঈদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। তার মুঠোফোনে কল, খুদে বার্তা এবং হোয়াটস অ্যাপে যোগাযোগের কারণ উল্লেখ করে বার্তা দেওয়া হলেও, তার পক্ষ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

আইসিটি বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সাথে যোগাযোগ করে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানো হলে, লিখিত জবাবে প্রতিষ্ঠানটির সাউথ এশিয়া অঞ্চলের এক্সটারনাল কমিউনিকেশন, ব্র্যান্ড এন্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান তানভির আহমেদ জানান, অংশীজনদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধিতে দেশ ও দেশের বাইরে কর্মশালা, সেমিনার, ফোরামসহ এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্র্যাকটিস। দেশের আইসিটি খাতের একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্য সবার মতো হুয়াওয়েও প্রকাশ্যে এই ধরনের আয়োজন করে। এধরনের আয়োজন বন্ধ করতে কোন সরকারি আদেশ হুয়াওয়ের কাছে আসেনি। সকল ক্ষেত্রেই এসব সফর সরকারি অনুমোদন ও প্রযোজ্য বিধি-নিষেধ মেনে সম্পন্ন হয়।