জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চলছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টার্গেট কিলিংয়ের ভয়ংকর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর এর নিশানায় রয়েছেন সম্মুখ সারির জুলাই বিপ্লবীরা। আসন্ন নির্বাচন বানচাল এবং প্রার্থীদের মধ্যে ভয়-ভীতি ছড়াতে হত্যার মিশনে নেমেছে একাধিক প্রফেশনাল কিলার গ্রুপ। তারা প্রকাশ্যে ফিল্মি কায়দায় গুলি করে হত্যার মতো নৃশংসতা চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের সহযোগিতায় এই কিলিং মিশনে নেমেছে বলে আওয়ামী লীগের একটি গোপন বৈঠকে হত্যার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি গোপন অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে ১১ ডিসেম্বরের পর সারা দেশে ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ ভয়ংকর নীলনকশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার বিষয়টি আওয়ামী লীগের একটি অনলাইন কমিউনিটির গোপন টেলিগ্রাম আলোচনার সূত্রে এসেছে। তবে এই পরিকল্পনার তথ্যের বিষয়ে অন্ধকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র বলছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং ঢালাও জামিনে বের হওয়া কুখ্যাত অপরাধীদের কারণে টার্গেট কিলিং দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এসব ঘটনা একদিকে জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও করছে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের দমনে অবিলম্বে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২’ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া জুলাইযোদ্ধাদের বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ জন্য একটি ছোট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
গত শুক্রবার সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি। বর্তমানে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। অভিযোগ উঠেছে, হাদিসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন জুলাই সংগঠকের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার আগাম সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, ‘টার্গেট কিলিং’য়ের তালিকায় হাদির পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সালাউদ্দিন আম্মারসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ জুলাই সংগঠকের নাম রয়েছে। এ ছাড়া ৩২ নম্বর ভাঙার যাবতীয় উসকানি দেওয়া হাসান রোবায়েত, হুজাইফা মাহমুদ হিযুসহ বেশ কয়েকজন। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতা টার্গেট কিলিংয়ে রয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি গোপন অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগ ও ‘ভারতের’ যৌথ উদ্যোগে ১১ ডিসেম্বরের পর সারা দেশে ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ ভয়ংকর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার বিষয়টি আওয়ামী লীগের একটি অনলাইন কমিউনিটির গোপন টেলিগ্রাম আলোচনার সূত্রে এসেছে। রূপালী বাংলাদেশের হাতে পৌঁছেছে সেই অডিও বার্তা, যা ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে। ওই অডিওর কথোপকথনে দাবি করা হয়েছে, আগামী ১১ তারিখ থেকে আমাদের কিছু ওয়েল ট্রেইন্ড এক্সপার্ট ঢাকা শহরে প্রবেশ করবে। ৫ আগস্টের আগে যেভাবে ¯œাইপার দিয়ে গুপ্তহত্যার করা হয়েছিল, তার চাইতেও ডাবল ধামাকা আকারে আমরা করতে চাইছি। শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামকে টার্গেট করে তিনটা ধাপে আমরা কাজ করছি। বাকি কিছু খুলনাকেন্দ্রিক হতে পারে, তবে সেটা পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ভর করবে।
অডিওতে নেতাকর্মীদের আশ^াস দিয়ে বলা হয়, ‘আমরা আপনাদের সুবিধার্থে এবং আপনাদের অংশগ্রহণকে প্রধান্য দিয়ে অলরেডি ঢাকা শহরে ছয়টি স্পট আমরা নির্ধারণ করেছি। সেই নির্ধারিত জায়গায় বেইজ করে আমরা আমাদের সমস্ত কর্মসূচি সাজিয়ে রেখেছি। ১১ ডিসেম্বর থেকে আমাদের টিম একটিভ হবে। বাংলাদেশে আলরেডি পুশইন করা শুরু হয়েছে। অপনাদের ঘাবড়ানোর কোনো কিছু নেই। আপনারা যেটা চিন্তা করছেন, তার চাইতেও অনেক বেশি আকারে সহিংসতা হবে, সেই প্রস্তুতি অলরেডি শুরু হয়েছে। অপনারা আশাহত হইয়েন না। সাহস হারাইয়েন না। রাজপথে থাকেন, বাকি কী করার দরকার, আমরা করে দিচ্ছি।’ তবে এই অডিও বার্তা সম্পর্কে শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি রূপালী বাংলাদেশ।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি গোপন মিটিং থেকে দেশজুড়ে গুপ্ত হামলা বা টার্গেট কিলিংয়ের তথ্যের যে অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, এমন কোনো তথ্য র্যাবের কাছে নেই। গুপ্ত হামলার পরিকল্পনা ও নির্দেশনাসংক্রান্ত ফাঁস হওয়া অডিওটি সঠিক কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। এমন তথ্য থাকলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকে। কিন্তু শুক্রবার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলার তথ্য ছিল বলে যেটি বলা হচ্ছে, সেই তথ্য কেউ র্যাবকে দেয়নি। দেওয়া হলে অবশ্যই র্যাব বিষয়টি নিয়ে কাজ করত।
গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোট ৫০ জন প্রার্থীকে টার্গেট করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম যোদ্ধা ওসমান হাদি ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক আশ্রয় পেলে বা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অবৈধ অস্ত্রের উৎস সরকারি নথিতে থাকতে পারে, কিন্তু দ্রুত সেই রুট উন্মোচন ও অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর তৎপরতা প্রয়োজন। না হলে এসব অস্ত্র ভোট প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারেও ব্যবহার হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থাকা প্রয়োজন, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া পরাজিত শক্তিও নানাভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে। আমরা অনেক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কথা বলছি, যেগুলো নিরসন করা দরকার। নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু সে জায়গাগুলোতে প্রত্যাশিত ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সহিংসতা একেবারে নতুন নয়। তবে আসন্ন নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। এরকম একটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়। কোথাও এটা একেবারে শূন্য বলা যায়। ফলে হাদির ওপর হামলার ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একে দ্রুততম সময়ে আমলে নিতে হবে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা এবং এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে হবে।
গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোর কমিটির মিটিং শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের দমনে লুট হওয়া এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযান আরও জোরদার ও বেগবান করতে দেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ফেইজ-২ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি ছোট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, হাদির ওপর হামলাটি আসন্ন নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপপ্রয়াস। এ ধরনের যেকোনো চেষ্টা সরকার কঠোর হাতে দমন করবে। তিনি জানান, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, অর্থাৎ প্রার্থীরা, তারা ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চাইলে অনুমতি দেওয়া হবে। যেসব প্রার্থী ইতোমধ্যে তাদের অস্ত্র জমা দিয়েছেন, তাদের অস্ত্র ফেরত দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, খুব দ্রুত দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা যাবে। এ ঘটনায় জড়িত কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন