একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। বর্তমানে যোগাযোগ থেকে শুরু করে শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই স্মার্টফোনের বিচরণ। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বড়দের জন্য যেমন-তেমন, শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে বিতর্ক। সম্প্রতি ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। প্রকাশিত গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য ছিল- ১৩ বছর বয়সের আগে শিশুকে স্মার্টফোন দেওয়া তাদের জন্য চরম বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জন্য স্মার্টফোন কেবল আসক্তি নয়; এটি তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।
গবেষণার প্রেক্ষাপট
গবেষণার নেতৃত্ব দেন ফিলাডেলফিয়া চিলড্রেনস হাসপাতালের শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক র্যান বারজিলে। যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি অঞ্চলের সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশি শিশুর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে এই পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর বয়স ১২-১৩ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময়েই তাদের শারীরিক গঠন ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়। এই গবেষণায় উঠে আসা পরিসংখ্যানগুলো রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। দেখা গেছে, যেসব শিশু ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন হাতে পেয়েছে, তাদের ঘুমের
সমস্যার ঝুঁকি যারা ১৩ বছর বা তার পরে ফোন পেয়েছে তাদের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ছে ৪০ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, স্মার্টফোনের নীল আলো এবং গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার প্রবণতা শিশুদের স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল ক্লক বা সার্কাডিয়ান রিদম নষ্ট করে দিচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩ হাজার ৪৮৬ জন টিনএজারের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল, যারা ১২ বছর বয়স পর্যন্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করেনি। কিন্তু ১৩ বছরে পদার্পণের পর যখন তারা ফোন হাতে পায়, তখন তাদের মধ্যে বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ এবং খিটখিটে মেজাজ লক্ষ্য করা গেছে। অধ্যাপক বারজিলের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিশুরা বাস্তব জগতের সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অনলাইন জগতের সাইবার বুলিং, অন্যকে দেখে হীনম্মন্যতায় ভোগা এবং লাইক-কমেন্টের গোলকধাঁধায় আটকে পড়ে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
স্মার্টফোনের স্ক্রিন টাইম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের শারীরিক শ্রম কমে যাচ্ছে। মাঠে খেলাধুলা বা দৌড়ঝাঁপের বদলে তারা ঘরের কোণে বসে ফোনে নিমগ্ন থাকছে। এর ফলে স্থূলতা বা ওবেসিটি মহামারি আকার ধারণ করছে, যা ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের এই ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক দেশ এখন আইন করে শিশুদের স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের লাগাম টেনে ধরছে। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির সরকার মনে করে, শিশুদের শৈশবকে রক্ষা করতে কঠোর আইনের কোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, ওহাইও এবং টেনেসিসহ বেশকিছু অঙ্গরাজ্য ইতোমধ্যে আইন পাস করেছে। এই আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের নিচের কোনো কিশোর-কিশোরী যদি সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে চায়, তবে তার মা-বাবার লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক। মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশও বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের কঠোর নীতিমালার কথা ভাবছে। শিকাগোর সাবেক মেয়র রাহম ইমানুয়েল শিশুদের এই স্মার্টফোন আসক্তিকে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
কেন ১৩ বছর বয়সই গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১২-১৩ বছর বয়সে শিশুদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বিকশিত হতে শুরু করে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এ সময়ে প্রযুক্তির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ তাদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়া ইন্টারনেটের অবারিত দুনিয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট বা ক্ষতিকর তথ্য খুব সহজেই শিশুদের নাগালের মধ্যে চলে আসছে, যা তাদের কোমল মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
অভিভাবকদের প্রতি বার্তা
গবেষক র্যান বারজিলে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি একদমই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।’ অভিভাবকদের প্রতি চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, সন্তানকে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে অন্তত কয়েকবার ভাবুন। স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে তাদের বই পড়া, ছবি আঁকা বা সশরীরে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যদি অপরিহার্য হয়েও পড়ে, তবে তা যেন অবশ্যই মা-বাবার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হয়। স্মার্টফোন আধুনিক সভ্যতার দান হলেও এর অপব্যবহার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিতে পারে। তেরো বছর হওয়ার আগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া মানে তাদের অজান্তেই বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই রাষ্ট্রীয় নীতিমালা এবং পারিবারিক সচেতনতা-উভয়কেই এখন একযোগে কাজ করতে হবে। আজ আমরা যদি সচেতন না হই, তবে আগামী দিনের ডিজিটাল পৃথিবী আমাদের শিশুদের জন্য আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে।

