রোহিঙ্গাসংকট ও বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরী জোরালো করার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ। এজন্য জাতিসংঘ এবং দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতিবিষয়ক প্ল্যাটফর্মে বার্ষিক চাঁদা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাসংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা ও প্রভাব বাড়াবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ‘ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর)’ এবং দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতিবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘প্ল্যাটফর্ম অন ডিজাস্টার ডিসপ্লেসমেন্ট (পিডিডি)’-এ বার্ষিক চাঁদা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আরিকুজ্জামান তিয়াষ। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব বরাবর। এই প্রস্তাবে ইউএনএইচসিআরে বার্ষিক ১০ হাজার মার্কিন ডলার এবং পিডিডিতে ৮ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাসংকটে ইউএনএইচসিআরের ভূমিকা ও বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নে ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশে গৃহীত যৌথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করছে সংস্থাটি।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশে কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘লিড কো-অর্ডিনেটর’ বা প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। এর ফলে রোহিঙ্গাসংক্রান্ত মানবিক সহায়তা, সুরক্ষা, নিবাস, নথিভুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাপনায় সংস্থাটির সিদ্ধান্ত ও অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের ব্যয় আঞ্চলিকভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যয় করেছে ১১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সংস্থাটির কার্যক্রমভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়। এ তথ্য বাংলাদেশে রোহিঙ্গাসংকটের ব্যাপকতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থায় ইউএনএইচসিআরের কেন্দ্রীয় ভূমিকা স্পষ্ট করে।
এ ছাড়া সংস্থাটি মিয়ানমারে চলমান কার্যক্রম পরিচালনায় একই বছরে আরো ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারÑ দুই দেশেই সংস্থাটির এই ব্যয় দেখায় যে, রোহিঙ্গাসংকটকে ইউএনএইচসিআর একটি আন্তঃসীমান্ত ও আঞ্চলিক মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে।
বৈশ্বিক তহবিলের সংকট এবং ইউএনএইচসিআরের আর্থিক চ্যালেঞ্জ
চিঠির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত দাতা দেশগুলোর মধ্যে তহবিল কমানোর উদ্যোগের কারণে বর্তমানে ইউএনএইচসিআর আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংস্থাটি প্রচলিত দাতা দেশগুলোর বাইরে বিকল্প দেশ এবং নতুন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জেনেভায় বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের প্রস্তাবের আলোকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে যে, ইউএনএইচসিআরের তহবিলসংকটের এই সময়ে বাংলাদেশ যদি চাঁদা প্রদান শুরু করে, তাহলে বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।
দাতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়তি প্রভাব
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউএনএইচসিআরে নিয়মিত চাঁদা প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হলে সংস্থাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে শুধু প্রতীকী দাতা নয়, বরং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বাস্তব প্রভাব রাখার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সুযোগ বাড়বে।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, দাতা দেশ হিসেবে যুক্ত হলে বাংলাদেশ ইউএনএইচসিআরের বিভিন্ন ফোরাম, নীতি আলোচনায় এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে, যা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে সহায়ক হবে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধ ও সুরক্ষায় ইউএনএইচসিআরের গুরুত্ব
তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমার থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধের ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংস্থাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়লে তা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে প্রত্যাবাসন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তাকাঠামো নির্ধারণে বাংলাদেশের বক্তব্য ও প্রস্তাব আরও গুরুত্ব পাবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাতা হিসেবে উদাহরণ
চিঠির চতুর্থ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরে শুধু প্রতিষ্ঠিত ধনী দাতা দেশই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোও চাঁদা প্রদান করছে। ২০২৫ সালে ফিলিপাইন ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, আলজেরিয়া ১ লাখ মার্কিন ডলার, ইন্দোনেশিয়া ৫৩ হাজার মার্কিন ডলার এবং থাইল্যান্ড ২০ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা প্রদান করেছে।
এই উদাহরণ তুলে ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই তালিকায় যুক্ত হতে পারে এবং এতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় হবে।
আইওএমে বাংলাদেশের বিদ্যমান চাঁদা প্রদানের নজির
এ ছাড়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)’-এ বার্ষিক ১০ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা প্রদান করে আসছে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে একই অঙ্কের চাঁদা প্রদান যুক্তিযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতি ও পিডিডির পটভূমি
চিঠির পঞ্চম অনুচ্ছেদে দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি বিষয়ে বৈশ্বিক উদ্যোগের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতদের ঝুঁকি নিরূপণ এবং তা প্রতিরোধে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালে ‘দ্য নানসেন ইনিশিয়েটিভ’ গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিটারিয়ান সামিট’-এ ১০৯টি দেশ নানসেন ইনিশিয়েটিভের আওতায় গৃহীত ‘প্রটেকশন এজেন্ডা’য় সম্মতি প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্ল্যাটফর্ম অন ডিজাস্টার ডিসপ্লেসমেন্ট (পিডিডি)’।
পিডিডিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও বর্তমান অবস্থান
নথির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ সালে পিডিডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে বাংলাদেশ সংস্থাটির স্টিয়ারিং গ্রুপের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রতিকূল প্রভাবের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে এ বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগে স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পামাড প্রকল্প ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা
সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পিডিডির উদ্যোগে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ‘অ্যাকশন অ্যান্ড সাপোর্ট টু অ্যাভার্ট, মিনিমাইজ অ্যান্ড অ্যাড্রেস ডিসপ্লেসমেন্ট রিলেটেড উইথ দ্য অ্যাডভার্স ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ (পামাড প্রকল্প)’ বাস্তবায়িত হয়েছে।
এ ছাড়া জলবায়ু, পরিবেশ এবং অন্যান্য কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে পিডিডি বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সদয় বিবেচনা প্রত্যাশা
সব দিক বিবেচনায় নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাব করেছে, ইউএনএইচসিআরে বার্ষিক ১০ হাজার মার্কিন ডলার এবং পিডিি তে বার্ষিক ৮ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা প্রদান করা হোক। এ বিষয়ে সদয় বিবেচনার জন্য প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন