বায়ান্নর ৪ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চতুর্থ দিনে ঢাকাসহ সারা দেশ ছিল ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে এর পূর্ণ প্রস্তুতি। ফলে আহূত এই ধর্মঘট সর্বাত্মক ধর্মঘটে রূপ নেয়। ধর্মঘট চলাকালে মিছিলে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ। পাশাপাশি মিছিলের আগে ও পরে সমাবেশে ছাত্রসমাজের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে গণমানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্যাপকসংখ্যক সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান ছাত্রসমাজকে উদ্বেলিত করে এবং সীমাহীন শক্তি জোগায়।
ওইদিনই তারা ভাবতে থাকে সামগ্রিক আন্দোলনকে আরও কীভাবে বেগবান করা যায়। অনেক ভাবনা-চিন্তা আর দফায় দফায় শলা-পরামর্শের পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তরফ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশজুড়ে হরতালের ডাক দেওয়া হয়। ৪ ফেব্রুয়ারির ওই ছাত্র সমাবেশের পরই ভাষাসৈনিকরা দলে দলে ভাগ হয়ে প্রদেশজুড়ে প্রচারে নামেন। একুশের কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রাবাসগুলো বিশেষভাবে তৎপর হয়ে ওঠে। সেই সময় ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের ছাত্রনেতা ও কর্মী এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ছাত্রদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এ ছাড়া জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মৃণাল বাবড়ি, আনিসুজ্জামান ও আহমদ হোসেন ছিলেন অন্যতম। ৪ ফেব্রুয়ারির সমাবেশে ব্যাপক লোকসমাগম ছাত্রদের এতই উদ্দীপ্ত করে তোলে যে, তারা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে জেলা ও মহকুমা শহরগুলোতে সফর শুরু করেন।
এদিকে বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতা ২১ ফেব্রুয়ারি হরতালের আগের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে অভিমত দেন। কিন্তু গণমানুষের ব্যাপক সমর্র্থনে বলীয়ান হয়ে ছাত্রসমাজ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মতামতকে অগ্রাহ্য করতেও পিছপা হননি। তারা ২১ ফেব্রুয়ারি হরতালের আগের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসেন। গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে হরতাল সফল হয়। ফলে এরপরই ঘটে ইতিহাসের বর্বরোচিত ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে সালাম, রফিক, জব্বার ও সফিউরসহ অসংখ্য তাজা তরুণ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। নিজের প্রাণের বিনিময়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বিশ্বের ইতিহাসে এভাবেই রচিত হয় এক অমর উপাখ্যান।

