বায়ান্নর ৫ ফেব্রুয়ারি ছিল এক অন্যরকম দিন। ভাষা আন্দোলনের শুরুতে সর্বস্তরের বাঙালির জাগরণ ঘটে এবং তা প্রকাশ্যে আসে এই দিনেই। এর আগের দিন ৪ ফেব্রুয়ারি মিছিল-সমাবেশে ঢাকা ছিল উত্তাল। ছাত্রদের মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ। সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে আলোড়ন তোলে ছাত্রদের গড়া ভাষা আন্দোলন। আগের দিনের মিছিল-সমাবেশ মানুষকে অসম্ভব রকমের আন্দোলিত করে। এই দিনের পর ঢাকাবাসীসহ পুরো পূর্ব বাংলার মানুষ ভাষা আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে দলবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে থাকে। একসময় তারা মিছিলে, স্লোগানে ও সমাবেশে অধিক সংখ্যায় যোগ দিতে শুরু করে। ফলে আন্দোলন এতই জঙ্গিরূপ ধারণ করতে থাকে যে, শাসকগোষ্ঠীর রীতিমতো ভিমরি খাওয়ার জোগাড়।
এভাবে দিন যত যেতে থাকে, তারা ততই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠতে থাকে। শাসকগোষ্ঠী তাই নির্যাতনের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তোলে। ওদিকে নির্যাতন যতই বাড়তে থাকে, আন্দোলন ততই তীব্র হতে থাকে, যা পরবর্তীতে দ্রুত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক হয়। ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন তার স্মৃতিকথায় লেখেনÑ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটের খবর পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। এদিন ঢাকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে অনেক বেশি সহমর্মিতা পোষণ করেন। অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজে সবার মুখে মুখে ফিরতে থাকে আগের দিনের অর্থাৎ, ৪ ফেব্রুয়ারির মিছিল-সমাবেশের গল্প। এই দিনের কর্মসূচিগুলো ছাত্রদের নতুন করে সাহসী করে তোলে।
ভাষাসংগ্রামীরা একুশে ফেব্রুয়ারির হরতাল ও মিছিল-সমাবেশ সফল করতে নবোদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আবাসিক হলগুলোতে ছাত্র-সংযোগ প্রস্তুতি চলে। নতুন নতুন কর্মী ও উদ্যমী তরুণেরা দলে দলে আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের সাফল্যে উজ্জীবিত ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে। এদিকে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের জরুরি অধিবেশন বসে ৫ ফেব্রুয়ারি। অধিবেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। (সূত্র : সাপ্তাহিক সৈনিক, ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)। আরেকজন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক তার স্মৃতিকথায় লেখেন, ৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে চলে সব কাজ। হরতাল, সভা, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি যথাযথভাবে পালনের জন্য বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠন তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে থাকে।
যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ একাধিক সংগঠন এ ব্যাপারে সক্রিয় ছিল। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও নিষ্ক্রিয় থাকেনি। তবে একুশের কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রাবাসগুলো ছিল বিশেষভাবে তৎপর। ৫ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা আন্দোলনের সমালোচনা করে সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করে। ‘প্রাদেশিকতা’ শিরোনামের ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বক্তব্য কায়েদে আজমেরই কথা। তার অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের শত্রুদের প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এটা জাতির পিতার প্রতি অবমাননা। প্রাদেশিকতার পক্ষে যারা কথা বলে, তারা রাষ্ট্রের শত্রু। তারা রাষ্ট্রের বুনিয়াদ ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। তাদের কোনাপ্রকার প্রশ্রয় দেওয়া অনুচিত।’
এ ধরনের উক্তি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে আন্দোলনের গোড়ার দিকে জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্যই এই আন্দোলন করা হইয়াছে।...উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে, অন্য কোনো ভাষা নহে। যে কেহ অন্য পথে চালিত হইবে, সে-ই পাকিস্তানের শত্রু।’ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক-শোষকদের এই সব হুমকি-ধমকি ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এবং সব নিবর্তনমূলক অগ্রাহ্য করে এই দেশের ছাত্র-জনতা ভাষা আন্দোলনকে ঠিকই এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং একসময় ছিনিয়ে এনেছেন চূড়ান্ত বিজয়।

