রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলা শহরে ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান বসানো, হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ বাড়তে থাকায় এবার সমন্বিত বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ‘টাকা দিয়ে দোকান বসাইছি, আবার প্রতিদিন চাঁদাও দিয়ে থাকি’ তা হলে ফুটপাত ছাড়ব কেন? রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে নেমেছে পুলিশ।
গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য মতে, প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এসব প্রতিরোধে মাঠে সক্রিয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এদিকে সড়কে চলাচলরতদের অভিযোগ, ফুটপাত এখন যেন চলার পথ নয়, এটি একটি অস্থায়ী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যার কারণে পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে সড়কপথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন, তাই সড়কেও হচ্ছে ব্যাপক যানজট। অন্যদিকে ঈদ সামনে রেখে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি বাড়লেও নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে পুলিশ।
জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেই এসব অপরাধে যুক্ত হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা শক্ত অবস্থানে রয়েছি। এসব নিয়ন্ত্রণে পুলিশও তৎপর রয়েছে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এর আগে গত সোমবার ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কঠোর হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের সব রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। এ সময় তিনি সারা দেশের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি পরিস্থিতির সার্বিক খোঁজ নেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
ফুটপাত এখন যেন অস্থায়ী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে : রাজধানীর ফুটপাতগুলো এখন আর কেবল পথচারীদের চলাচলের জায়গা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হয়েছে অস্থায়ী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ফার্মগেট, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মতিঝিল, পল্টন, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বাড্ডা, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ীসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাতজুড়ে বসছে বিভিন্ন পণ্যের দোকান। নিউমার্কেটে কথা হয় চলাচলরত ব্যবসায়ী রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ফুটপাত এখন যেন চলার পথ নয়, এটি একটি অস্থায়ী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। রাকিবুলের মতো অসংখ্য মানুষের এমন অভিযোগ। পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে নতুন করে ভাসমান ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে সড়কপথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে যেমন তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও নগরজীবনের বিশৃঙ্খলা।
সম্প্রতি ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ফুটপাতের দৈর্ঘ্য ৪৩০ কিলোমিটার। সেখানে অন্তত তিন লাখ হকার ব্যবসা করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী চক্র এসব হকারের কাছ থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার ১৬০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
‘টাকা দিয়ে দোকান বসাইছি, আবার প্রতিদিন চাঁদাও দিয়ে থাকি’ : রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, ‘টাকা দিয়ে দোকান বসাইছি, আবার প্রতিদিন চাঁদাও দিতে হয়। এহানে বহার লাইগা প্রতিদিন টেকা দেওন লাগে।’ লক্ষ্মীবাজারে ষাটোর্ধ এক ডাব বিক্রেতা বলেন, ‘আমি বাবা বুড়া মানুষ, এই ডাব বেইচ্চাই চলি আর এই আমার মতো এই বুড়রা মানুষের থেইকাও দৈনিক ২০০ টাকা লইয়া যায়।’ যদিও বেশির ভাগ দোকানি বলছেন, চাঁদা দিয়ে দোকান করতে হলেও আমাদের ব্যবসা তো হয়। ছেলে-সন্তান নিয়ে দুমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি। মানুষও হাঁটুক, আমাদেরও ব্যবসা হোক।
ফুটপাত দখলের কারণে বেশি দুর্ভোগে সাধারণ পথচারীরা : এদিকে ফুটপাত দখলের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ পথচারীরা। নিয়মিত যানজট, সড়কে হাঁটার ঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্মীবাজার এলাকার এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজধানীর ফুটপাতগুলো চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। যার কারণে বার বার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না। সকালে উচ্ছেদ করলে সন্ধ্যায় আবার চলে যায় সিন্ডিকেটের দখলে। সিটি করপোরেশন ও সরকারের প্রচেষ্টাতেও দখলমুক্ত হচ্ছে না।’
সরকারপ্রধানের কঠোর বার্তা : বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেনÑ দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, যে দুর্নীতি করে, সে দুর্নীতিবাজ, সে কোনো দলের নয়। যে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, মানুষকে কষ্ট দেয়, সে কোনো দলের হতে পারে না, সে অপরাধী। কাজেই আইন এদের ক্ষেত্রে আইনের গতিতে চলবে।’ এদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত ও চাঁদাবাজি নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোথাও কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা হয়রানি বরদাশত করা হবে না। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি ফৌজদারি মামলাও করা হবে।
এ ছাড়াও অবৈধ দখল উচ্ছেদে সমন্বিত পদক্ষেপের কথা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে শিগগির কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ডিসি ট্রাফিক, সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ, সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট ও সম্পত্তি বিভাগের সঙ্গে শিগগির বৈঠক করা হবে। পাশাপাশি মার্কেট মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তবেই একদিকে পথচারীদের চলাচল স্বাভাবিক হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
চাঁদাবাজদের ঠাঁই বাংলার মাটিতে হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া আছে। তা ছাড়া প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নেই। এটা সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। জনতার যাতে চলাচল বা নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি বা সমস্যা না হয় সেই বিষয়ে সরকার কঠোর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, খুব শিগগিরই দেশব্যাপী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারের অভিযান পরিচালনা করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আমরা চাঁদাবাজদের তালিকা প্রস্তুত করে খুবই শিগগিরই দেশব্যাপী বিশেষ করে ঢাকা থেকে অভিযান শুরু করব। সেজন্য চাঁদাবাজদের তালিকা প্রস্তুত করে সেই হিসেবে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশনা নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। দ্বিতীয়ত, যারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, দাগী আসামি, যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করে সে হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানতম অগ্রাধিকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি প্রদান করা ও দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, আমরা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আর এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কোনো চাঁদাবাজদের ঠাঁই বাংলার মাটিতে হবে না, সরকার এসব বিষয়ে খুব সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

