যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করলেও সাবেক ব্যাংকার নিজাম আহমেদকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। বিসিসির ‘বিজিডি ই-গভ সার্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক তথা ই-গভ সার্ট প্রকল্পে ‘মার্কেটিং অ্যান্ড বিজনেস স্পেশালিস্ট’ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। এই পদে নিয়োগের অন্যতম যোগ্যতা হলো চারটি পেশাদার সনদের অন্তত দুটি থাকতে হবে। সেই সঙ্গে তার থাকতে হবে নির্দিষ্ট কাজে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসহ জাতীয় ডাটা সেন্টার সলিউশন, ব্যাবসায়িক বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও বাজেট, অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ফলাফলভিত্তিক বিপণন ও যোগাযোগের সচেতনতা বৃদ্ধি পরিচালনার অভিজ্ঞতা। এসব সনদ ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও মাসিক দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতনের এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন নিজাম।
অভিযোগ উঠেছে, তার চেয়েও যোগ্য প্রার্থী থাকলেও একটি বিশেষ মহলের তদবিরে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অগ্রাহ্য করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নিজাম আহমেদকে। এমনকি তার নিয়োগ সুনিশ্চিত করতে আরেক প্রার্থীর জমা দেওয়া নথি প্রকল্প কার্যালয় থেকে ‘গায়েব’ করারও অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট ‘মার্কেটিং অ্যান্ড বিজনেস স্পেশালিস্ট’সহ মোট ১৫টি পদে পরামর্শক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সার্ট প্রকল্প কার্যালয়। প্রকল্পের উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, এই পদে মাসে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন হতে পারে পরামর্শকের। পরামর্শক হতে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া ওই বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পদে আবেদনকারীকে যোগ্য হতে হলে বিভিন্ন শর্ত পূরণের পাশাপাশি তার লাগবে মাস্টার্স বা এমবিএ ডিগ্রি, বিপণন বা ব্যাবসায়িক কাজে ন্যূনতম ১০ বছরের প্রমাণিত অভিজ্ঞতা, ডাটা সেন্টার সলিউশনের প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পণ্য ও প্রযুক্তির প্রসারে সহায়তা করার সক্ষমতা, বিভিন্ন ই-সেবা প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থাসমূহের সম্পর্ক স্থাপন কাজে অভিজ্ঞতা, ডেটা সেন্টার সলিউশনের প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পণ্য ও প্রযুক্তির প্রসারে সহায়তা করা এবং বিশেষায়িত চারটি পেশাদার সনদের মধ্যে অন্তত দুটি।
এগুলো হলোÑ আইএসও ২৭০০১ লিড অডিটর, ইনফরমেশন টেকনোলজি ইনফ্রাস্ট্রাকচার লাইব্রেরি (আইটিআইএল), প্রজেক্ট ইন কনট্রোলড এনভায়রনমেন্ট (প্রিন্স-২) এবং সার্টিফায়েড ইনফরমেশন সিস্টেম অডিটর (সিসা)। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়োগপ্রাপ্ত পরামর্শক নিজাম আহমেদের সংশ্লিষ্ট কাজে যেমন কমপক্ষে ১০ বছরের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, সেই সঙ্গে ডাটা সেন্টার সলিউশন, ই-পরিষেবা/ ব্যবসা বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষা-সংক্রান্ত কোনো কাজে নেই কোনো অভিজ্ঞতা, তেমনি নেই উল্লেখিত চারটি সনদের একটিও। তবুও নিজামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক কাজের অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতার অভাব থাকা সত্ত্বেও মূল্যায়ন বিভাগে নিজামের সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, নিজাম আহমেদ এই পদে পরামর্শক হওয়ার আগে দীর্ঘদিন দেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মরত ছিলেন। সবশেষ ন্যাশনাল ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদায় ব্র্যাঞ্চ অপারেশন্স বিভাগের প্রধান ছিলেন। অভিযোগ আছে, ন্যাশনাল ব্যাংকের তৎকালীন মালিকপক্ষ ‘শিকদার’ পরিবারের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, শিকদার পরিবারের তদবিরেই সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সরাসরি নির্দেশে নিজামের নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। আর এতে সহযোগিতা করেন বিসিসির নির্বাহী পরিচালক মো. আবু সাঈদ এবং প্রকল্পের পরিচালক হোসেন বিন আমিন। নিজাম আহমেদের নিয়োগে পদে পদে ভাঙা হয় পিপিআরের বিধান। এগুলোর মধ্যে আছেÑ বিধি-৬ (আবেদনকারীর নথি সংরক্ষণ), বিধি-১০৪ (যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মেধারভিত্তিতে নিয়োগ), এবং বিধি-১১২ (২) (যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ সামর্থ্যরে প্রমাণ)। প্রকল্প কার্যালয় এবং বিসিসি উল্লেখিত বিধিগুলোর কোনোটি অনুসরণ না করেই গত নভেম্বরে নিজাম আহমেদের নিয়োগ চূড়ান্ত করে। উপরন্তু, পরামর্শক হিসেবে নিজাম আহমেদের নিয়োগের কোনো তথ্য পাবলিক ডোমেইনে দেখা যায়নি। প্রকল্প কার্যালয়, বিসিসি এবং আইসিটি বিভাগের কোনো ওয়েবসাইটেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। এমনকি সার্ট প্রকল্পের ওয়েবসাইটে প্রকল্প কর্মকর্তাদের কোনো তথ্য নেই, যা পূর্বে ছিল।
উপরন্তু, অন্য প্রার্থীদের জমা দেওয়া নথি গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে গত ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে যথাক্রমে আইসিটি বিভাগের সচিব এবং সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে নথি গায়েব হওয়া প্রার্থী মিজানুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আইসিটি বিভাগের একটি মহল যেভাবেই হোক নিজাম আহমেদকে নিয়োগ দিত। এজন্য আমার ফাইল থেকে সার্টিফিকেট সরিয়ে ফেলেছে। আমি সার্টিফিকেট জমা দেইনি, এটা হতেই পাওে না কারণ তেমনটা হলে আমাকে শর্ট লিস্ট করারই সুযোগ ছিল না। শর্ট লিস্টে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে আমি সব থেকে ‘ডিজার্ভিং’ তথা যোগ্য ছিলাম। তাই আমাকে বাদ দিতেই ইন্টারভিউয়ের ঠিক আগে আমার নথি গায়েব করা হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নিজাম আহমেদের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ে যোগাযোগ করলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন উল্লেখ করে ফোন কেটে দেন তিনি। এরপর প্রকল্প পরিচালক হোসেন বিন আমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। বিসিসির নির্বাহী পরিচালক আবু সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মিটিংয়ে থাকায় পরে ফোন করতে বলেন। এরপর কয়েক দফা ফোন করেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

