কোনো উপজেলা বা জেলা সদরও নয়, সিলেটের একটি ইউনিয়নকে পৌরসভা করতে তৎপরতা শুরু করেছে প্রশাসন। এই ইউনিয়নের নাম জাফলং। এটি সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন। তবে জাফলং পর্যটন ও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। সেখানে সরকারি অফিস-আদালত, আবাসিক এলাকা না থাকলেও শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই একটি ডিও লেটার দেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর। তারপর জাফলংকে পৌরসভা করার উপযোগিতা যাচাই করতে সিলেটে চিঠি পাঠায় স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সিলেটে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
স্থানীয়দের অধিকাংশই মন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। জাফলংয়ে বসবাসকারীদের অনেকে খুশি। তবে কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু জাফলং একটি ইউনিয়ন। শুধু পর্যটন এলাকা এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক বন্দর আছেÑ এর ভিত্তিতে জাফলংকে পৌরসভা করা যুক্তিসংগত নয়। এর চেয়ে উপজেলা সদর কিংবা তিন উপজেলার মধ্যবর্তী জংশন হিসেবে পরিচিত সালুটিকর বাজার এলাকাকে পৌরসভা করা যেতে পারে।
আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটের সাবেক মেয়র। সিলেটের বাসিন্দা হলেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ভারতীয় সীমান্তবর্তী সিলেট-৪ সংসদীয় আসন থেকে। এ আসন জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে রয়েছে বাণিজ্যিক স্থলবন্দর। এ দুই জায়গাতেই রয়েছে সাদা পাথর। জাফলং পর্যটনশিল্পের জন্য বিখ্যাত। আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনের আগে স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাফলংকে পৌরসভা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগে জাফলংকে পৌরসভায় উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি ডিও লেটার দেন। চিঠি পেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে সিলেট জেলা প্রশাসককে জাফলংয়ে প্রস্তাবিত পৌরসভার সার্বিক অবস্থান, জনসংখ্যা, আয়ের উৎসসহ সব পরিসংখ্যান জানাতে বলা হয়। সিলেট প্রশাসন সেই লক্ষ্যে এখন কাজও করছে বলে জানান জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম।
সিলেট জেলা প্রশাসকের দপ্তরের স্থানীয় সরকার বিভাগ এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে। প্রশাসন সূত্র জানায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রিপোর্ট পাঠানো হতে পারে সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে।
গত ২৫ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে পাঠানো চিঠিতে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী উল্লেখ করেন, জাফলং দেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। স্থানীয় পর্যটনের বিকাশ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ, নগরসুবিধা ও জনসেবার সম্পৃক্তকরণ এবং পর্যটনব্যবস্থার উন্নয়নে জাফলংকে পৌরসভায় উন্নীত করা জরুরি। জাফলং পৌরসভায় উন্নীত হলে স্থানীয় মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে।
ডিও লেটারে মন্ত্রী জাফলংয়ে সড়কব্যবস্থা অনুন্নত ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, জাফলং পৌরসভায় উন্নীত হলে নাগরিক সুবিধা বাড়বে। এতে পর্যটকেরা উন্নত সেবা পাবেন।
এদিকে জাফলংকে পৌরসভা করার প্রস্তাব আসার পর স্থানীয়দের অনেকেই পৌরসভায় উন্নীত হওয়ার মতো সেখানকার সার্বিক অবস্থান, জনসংখ্যা, আয়ের উৎসÑ এসব নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্থানকে, যেখানে জনসংখ্যা তুলনামূলক কম, তাকে পৌরসভায় উন্নীত করার উদ্যোগে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের অনেকে বিকল্প স্থানের নামও প্রস্তাব করেন।
সিলেট-৪ আসনের বাসিন্দা সিনিয়র সাংবাদিক রাজু আহমেদ বলেন, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলাকে পৌরসভা করার জন্য প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ বা ডিও লেটার দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও প্রস্তাব রয়েছে। পর্যটন এলাকা, অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে কাজে লাগানো এবং পরিকল্পিত নগরী নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। তবে আমি মনে করি, তিন উপজেলার সংযোগস্থল সালুটিকর হতে পারে পৌরসভার জন্য উপযুক্ত স্থান। এর আশপাশে রয়েছে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদর।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তিন উপজেলার মোহানা ঐতিহ্যবাহী সালুটিকর এলাকাকে থানা ও উপজেলা ঘোষণার দাবিতে ১৯৯৩ সাল থেকে স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেকের প্রস্তাব, আগে সালুটিকরকে থানা বা উপজেলা করা অপরিহার্য। তারপর এর সদর এলাকা নিয়ে পৌরসভা হতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর বা কোম্পানীগঞ্জ বাজারকে পৌরসভা ঘোষণা করা যেতে পারে। সালুটিকর বাজার এত উন্নত নয়, জনসংখ্যাও কম।
যদিও বেশি সংখ্যক মানুষের মতে, পর্যটন ও স্থলবন্দর এলাকাকে আরও উন্নত করতে, আধুনিক সুবিধা বাড়াতে জাফলং ও কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর এলাকাকে পৌরসভায় উন্নীত করা যায়। কোম্পানীগঞ্জ সদরকে পৌরসভা করলে সাদা পাথর এলাকাও পৌর এলাকায় রূপান্তরিত হবে। এতে একই সঙ্গে পর্যটন ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন