গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের। আর হামের লক্ষণ নিয়ে বা সন্দেহজনক হিসেবে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৫১ শিশুর। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসের ১৩ দিনেই মৃত্যু হয়েছে একশর বেশি শিশুর। এর একমাত্র কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে মারাত্মক অবহেলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত প্রায় দেড় বছর স্বাস্থ্য খাতের কোনো অপারেশন প্ল্যান না থাকায় ইউনিসেফকে তারা টিকার জন্য কোনো টাকা দেয়নি। বরং দরপত্রের মাধ্যমে উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় টিকা কিনতে গিয়ে সব হ-য-ব-র-ল করে ফেলেছে। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। মা-বাবাকে শিশুসন্তানের লাশ বইবার মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব সব শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি অতি সংক্রামক রোগটি নিয়ন্ত্রণে একটি ডেডিকেটেড হাসপাতালের তাগিদ দিয়েছে তারা।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি হয়নি। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করে বাংলাদেশ সরকার। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচিটি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের কাছে ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। এটি বাস্তবায়ন করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি) তথা বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এতদিন সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো।
এক্ষেত্রে টিকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ এতদিন টিকা কিনত ইউনিসেফের মাধ্যমে। ২০২২ সালে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিসহ নানান কারণে সেটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার নিয়ে নানান আলোচনার মধ্যে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে নিজেরা টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু মূলত কোনো অপারেশন প্ল্যানই ছিল না এই সরকারের; যা খোদ রূপালী বাংলাদেশের কাছে স্বীকার করেছেন তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর। তিনি বলেছিলেন, বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম চলায় কোনো অপারেশন পরিকল্পনা নেওয়া হবে না এই সরকারের আমলে। সম্প্রতি হামের প্রকোপ বাড়ার কারণ কি এই অপারেশন প্ল্যান না থাকায় হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ো কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা এতদিন দেখেছি এর মাধ্যমে খাদ্য-পুষ্টি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদানসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা, জনবল নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এতদিন সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো। এক্ষেত্রে টিকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ এতদিন টিকা কিনত ইউনিসেফের মাধ্যমে। এতে টিকা কিনতে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হতো না এবং সময়ও তুলনামূলকভাবে কম লাগত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার অতি মাতবরি করতে গিয়ে এই কার্যক্রম বাতিল করে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কিনা কর্মসূচির পরিকল্পনা নেয়; যা বাস্তবায়ন তো করেইনি বরং উল্টো সব ঘেঁটে দিয়ে গেছে। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন সাধারণ মানুষকে। কোমলমতি শিশুদের দিতে হচ্ছে প্রাণ।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদান কর্মসূচির কারণে দেশে এক সময় হামের প্রকোপ কমে এলেও চলতি বছর তা আবার বেড়েছে। গত ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং ১০ জানুয়ারি সেখানে সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি এলাকাতেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি, যাদের বড় অংশই হাম আক্রান্ত শিশু।
এসব বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা সম্পূর্ণ ভঙ্গুর একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পেয়েছি। হঠাৎ করে হামের এই ঊর্ধ্বগতি আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক মাসের মাথায় আমাদের একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তবে আমরা তা মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে দেশের অতি সংক্রামক ৩০ উপজেলাসহ রাজধানীর দুই সিটিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে দিয়েছি। হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ডিএনসিসির বিভিন্ন ওয়ার্ড, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর যাবৎ বিশেষ টিকা কর্মসূচি হয়নি। চার বছর পর এই কর্মসূচি হওয়ার কথা। তিনি দাবি করেন, ফ্যাসিস্ট সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণে বর্তমানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। তাদের ভুল ব্যবস্থাপনার কারণেই হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর যাবৎ হয়নি; যা চার বছর পর পর হওয়ার কথা। ফলে নতুন জন্ম নেওয়া শিশুসহ অন্যরা হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, যারা এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। টিকা কেনা ও সংগ্রহে পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে টিকার মজুতে সংকট দেখা দিয়েছে। এতে হামের টিকাসহ আরও ছয় ধরনের টিকার অভাব দেখা দেয়। যার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুততম সময়ে সব শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি অতি সংক্রামক এই রোগটির জন্য বিশেষায়িত একটি হাসপাতাল ঘোষণা করার কথা বলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ।
রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, এই রোগটি এত সংক্রামক যে এক শিশু থেকে অন্য শিশু খুব সহজেই আক্রান্ত হয়ে যায়। আর যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম তাদের করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হয়। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যে মহামারি আমরা হামের দেখছি তা এর আগে কখনোই দেশে দেখা যায়নি। দেশে বসন্তকালে হাম, রুবেলা, পক্স এগুলো খুবই সাধারণ রোগ ছিল শিশুদের ক্ষেত্রে। কিন্তু হঠাৎ করেই এটি কেন মহামারি হয়ে উঠল। এর একটি কারণ তো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। অন্যটি অন্তর্বর্তী সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে অনীহা। বলা যায় তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই এখন এসব কোমলমতি শিশুদের মৃত্যুবরণ করতে হবে। তবে মৃত্যু কমানো সম্ভব। সংক্রমিত শিশুদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে এসে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এর চিকিৎসায় ডেডিকেটেড একটি হাসপাতাল হলে সবচেয়ে ভালো হয়। এক্ষেত্রে ডিএনসিসির করোনা হাসপাতালটিকেও ডেডিকেটেড করা যেতে পারে। যেহেতু এটি এখন প্রায় অব্যবহৃতই রয়েছে। তা হলে হাম আক্রান্ত শিশুদের স্বজনদের কোথায় চিকিৎসা নিতে যাবে এ নিয়ে আর দ্বিধায় থাকতে হবে না।

-20260415052648.webp)

