রাজনৈতিক পরিবেশ আবারও অস্থির হওয়ার আশঙ্কা করছে জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলো। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক প্রপাগান্ডা ও গোপন তৎপরতা ফের শুরু হয়েছে বলছেন তারা, যার অংশ হিসেবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশকে অশান্ত করতে নতুন ছক কষছেন। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির নেতত্বে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সম্ভাবনার শঙ্কা দেখছেন তারা, যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ফেলতে পারে বলে মত তাদের।
এনসিপির নেতারা বলছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অপপ্রচার ছড়িয়ে নতুন সংঘাতের চেষ্টা চলছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের যেকোনো জটিল পরিস্থিতি সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব।
এদিকে জাতীয় সংসদে নিষেধাজ্ঞা বহালের সুযোগ রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে যে গুঞ্জন ছিল, সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে সেটি কতখানি সফল হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের ওপর। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও সম্প্রতি দলটির পক্ষে নানা কার্যক্রম সামনে আসছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও গত কয়েক দিনে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জায়গায় নানা তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির নেতাকর্মীদের মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি দলটির কিছু নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা উসকানি ও হুমকিমূলক পোস্ট করছেন। এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে শপথ নিতে দেখা যাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীদের।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও দলীয় নেতাকর্মীরা নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ও সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের প্রায় পৌনে দুইশ আইনজীবী। তারা সেখানে দ্রুতই দলটির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারেও দাবি জানিয়েছেন।
এমন আশঙ্কার কথা বিবেচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশে ‘সাম্প্রদায়িকতা ও প্রপাগান্ডা’ ছড়ানোর প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এলাকা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফলের পরে বাংলাদেশের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, থ্রিষ্টান সবার নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে।
তিনি জুলাই সনদ ও সংস্কার ইস্যু টেনে বলেন, আমরা আবারও প্রস্তুতি নিচ্ছি; দল-মতনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ আছি। এটি কোনো দলের বিষয় নয়, এটি কোনো জোটের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশকে রক্ষা করার বিষয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রক্ষা করার বিষয়। জুলাইয়ের শহিদদের রক্ত যাতে বৃথা না যায়, এটি সেই উদ্যোগের বিষয়। এর জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশের মানুষ আন্দোলন করেছে। অথচ নতুন সরকার সেসবে গুরুত্ব না দিয়ে আবারও পুরোনো পথে হাঁটছে। কোনো দেশের প্রেসক্রিপশন মেনে নেওয়া হবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পসহ সব খাত স্বাধীন হতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অনেক পুরোনো রাজনৈতিক দল। তারা বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ফলে তাদের তো ফিরে আসার প্রচেষ্টা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সুযোগ দেবে কি না, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ, নাগরিক সমাজ কিংবা গণমাধ্যমের চাপের কারণেই সরকার চাইলেও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারবে না বলেও মনে করেন তারা। তবে, দলটি নতুন করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি না করলে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাবে। একই সঙ্গে সরকার কতটা সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করবে তাদের ফিরে আসার বিষয়টি। তবে রাজনীতিতে যে কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলা সরকারকেই করতে হবে বলেও মনে করছেন তারা।

