ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

এআই দিয়ে তৈরি বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন রুখবে মহামারি

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৬:১৪ এএম

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন, যা ভাইরাসের যেকোনো রূপান্তরকে রুখে দিয়ে ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের দাবি, এটিই বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন যার মূল উপাদানটি কোনো ল্যাবরেটরিতে প্রথাগত উপায়ে নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে এআইর মাধ্যমে ডিজাইন করা হয়েছে এবং এরই মধ্যে মানুষের শরীরে এর সফল পরীক্ষা বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও সম্পন্ন হয়েছে।

সাধারণত প্রচলিত ভ্যাকসিনগুলো তৈরি হয় ভাইরাসের বিদ্যমান কোনো নির্দিষ্ট স্ট্রেইন বা রূপ থেকে। কিন্তু ভাইরাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এরা খুব দ্রুত নিজেদের চেহারা বা জিনগত কাঠামো পরিবর্তন (মিউটেশন) করতে পারে। এই কারণেই কোভিড-১৯ বা শীতকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভ্যাকসিনগুলো কিছুদিন পরপর আপডেট করতে হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, ‘ভাইরাসের এই পরিবর্তনের দৌড়ে আমরা সবসময় পিছিয়ে থাকি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ভাইরাসের চেয়ে এক কদম এগিয়ে থাকা, যেন নতুন কোনো মহামারি ছড়ানোর আগেই আমরা তার প্রতিকার তৈরি রাখতে পারি।’

এই লক্ষ্য পূরণে গবেষকরা এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নেন। তারা বিশ্বজুড়ে ভাইরাসের ওপর নজরদারি চালানো বিভিন্ন প্রোগ্রাম থেকে পাওয়া অসংখ্য করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড (যা মূলত ভাইরাসের জীবন পরিচালনার নির্দেশিকা) সংগ্রহ করেন। এরপর এই বিশাল তথ্যভা-ার বা ডেটা অ্যানালাইসিস করার দায়িত্ব দেওয়া হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। এআই নিখুঁতভাবে বিভিন্ন ভাইরাসের সাধারণ এবং অপরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ ডিজাইন করে। অ্যান্টিজেন হলো ভ্যাকসিনের সেই মূল অংশ, যা দেখে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শত্রুকে চিনতে শেখে এবং তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয়। এআইর তৈরি এই সুপার-অ্যান্টিজেনটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে, যাতে ভাইরাসটি ভবিষ্যতে রূপ পরিবর্তন করলেও বা পশুপাখি থেকে নতুন কোনো রূপ নিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলেও শরীর তাকে সহজেই ধ্বংস করে দিতে পারে।

ভ্যাকসিনটি আসলেই কতটা নিরাপদ, তা যাচাই করতে ৩৯ জন সুস্থ মানুষের ওপর প্রথম ধাপের ট্রায়াল চালানো হয় এবং ফলে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ প্রমাণ হয়েছে। যদিও প্রথম ধাপে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব কিছুটা ‘মাঝারি’ বা পরিমিত ছিল, তবু বিজ্ঞানীদের মাঝে এটি নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রায় ২০০ জন মানুষের ওপর এর দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা চালানো হবে, যা থেকে বোঝা যাবে এটি মানুষের শরীরে ঠিক কতটা শক্তিশালী সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারছে।

এই প্রযুক্তির সাফল্য কেবল করোনা ভাইরাসেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কেমব্রিজ গবেষক দলটি এরই মধ্যে এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বজনীন ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) এবং বার্ড ফ্লুর ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছেন, যা পশুপাখি থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া মহামারি রুখে দেবে। একই সঙ্গে তারা আফ্রিকার কঙ্গোতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলার মতো মারাত্মক রক্তক্ষরণকারী জ্বরের ভ্যাকসিন তৈরির জন্যও প্রাণীদের ওপর গবেষণা চালাচ্ছেন।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক অ্যান্ডি পোলার্ড এই গবেষণাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, ল্যাবরেটরির ইঁদুরের চেয়ে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক জটিল এবং বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সংক্রমণের কারণে এটি ভিন্নভাবে সাড়া দেয়। তাই মানুষের ওপর ট্রায়ালের চূড়ান্ত ফলই হবে এর আসল পরীক্ষা। সামগ্রিকভাবে ব্রিটেনের বিজ্ঞানমন্ত্রী লর্ড ভ্যালেন্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একমত যে, ভ্যাকসিন গবেষণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ বা যুগান্তকারী মোড় হতে যাচ্ছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচাবে।