করলা আমাদের দেশের অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি সবজি। বিশেষ করে গরমের দিনে করলা ভাজি, ঝোল কিংবা করলার রস অনেকেই নিয়মিত খেয়ে থাকেন। তিতা স্বাদের হলেও পুষ্টিগুণে ভরা এই সবজি দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হজমশক্তি উন্নত করা এবং ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যেকোনো উপকারী খাবারের মতো করলাও পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। অতিরিক্ত করলা বা করলার রস খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যারা দ্রুত ওজন কমাতে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিন বেশি পরিমাণে করলার রস পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
করলার সবচেয়ে পরিচিত উপকারিতা হলো, এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা চারান্টিন, মোমরডিসিন ও ইনসুলিনের কিছু উপাদান রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ডায়াবেটিসের ওষুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত করলা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়, যার ফলে মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, দুর্বলতা, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
শুধু রক্তে শর্করাই নয়, অতিরিক্ত করলা লিভারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। করলায় থাকা কিছু সক্রিয় উপাদান অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত করলার রস পান করলে লিভারের এনজাইমের ভারসাম্য বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে লিভারে প্রদাহ, কোষের ক্ষতি এবং কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই যাদের আগে থেকেই লিভারের সমস্যা রয়েছে, তাদের করলা খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে করলায় প্রচুর ফাইবার থাকলেও অতিরিক্ত খেলে পরিপাকতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা, গ্যাস, বদহজম, বমি ভাব কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের অন্ত্র সংবেদনশীল বা আগে থেকেই হজমের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত করলা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের জন্য অতিরিক্ত করলা খাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত করলা খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকরা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন, কারণ করলায় থাকা কিছু উপাদান জরায়ুর সংকোচন বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ফলে গর্ভাবস্থার শুরুতে অতিরিক্ত করলা বা করলার রস খেলে রক্তপাত কিংবা গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটি খাওয়া উচিত। এ ছাড়া কিছু প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, করলার বীজ ও রস অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে প্রজনন হরমোনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যদিও মানুষের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবুও বিশেষজ্ঞরা অতিরিক্ত করলা খাওয়ার ক্ষেত্রে সংযমের পরামর্শ দেন।
পুষ্টিবিদদের মতে, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন করলা ভাজি বা তরকারি খাওয়া সাধারণত নিরাপদ। আর করলার রস পান করতে চাইলে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ মিলিলিটারের বেশি না খাওয়াই ভালো। করলা নিঃসন্দেহে একটি উপকারী ও পুষ্টিকর সবজি। তবে মনে রাখতে হবে, উপকারিতা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমিত পরিমাণে খেলে করলার গুণাগুণ সঠিকভাবে পাওয়া যায়, আর অতিরিক্ত খেলে তৈরি হতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।

