ঢাকা শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

স্বেচ্ছাচারী বাস-নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিরিকশা

রাজধানীর সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা

ফারুক আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০১:১৯ এএম

রাজধানীতে তীব্র যানজট সাধারণ মানুষের নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হওয়া তীব্র যানজটে নাকাল হতে হয় রোগী, ইমাজেন্সি সার্ভিস, অফিসগামীসহ সব পেশার মানুষকে। ফিটনেসবিহীন পাবলিক বাসের বেপরোয়া চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ফুটপাত দখল, ট্রাফিক সিগন্যালসহ নির্ধারিত স্টপিজ না মানার সঙ্গে অন্যতম কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে প্রধান সড়কে বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দ্বৈরথ।

এদিকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রয়ে বর্তমান সরকার শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেট ও বিমানবন্দর সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্যামেরা বসিয়েছে। এছাড়া আরও শতাধিক এআই ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও এইআই-সুবিধা কিছুদিন পাওয়ার পরই বাংলামোটর ও কারওয়ান বাজারে তা বন্ধ থাকছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় তীব্র যানজটের চিত্র। আজিমপুর থেকে মিরপুর, নিউমার্কেট থেকে সাভার-নগবীনগর-জিরানী, গাবতলী থেকে উত্তরাসহ এয়াপোর্ট, গুলিস্তান থেকে উত্তরা রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর বেহাল দশা দেখা যায়। রাস্তাগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল চোখে পড়ে। অনেকগুলোর জানালার কাচ ভাঙা, সিটগুলো নড়বড়ে। এ ছাড়া বেশির ভাগই সিটের ভেতরে পা রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। প্রতিটি রুটের একই কোম্পানির বাসগুলোর মধ্যে দেখা যায় ধাক্কাধাক্কি, যাত্রী নেওয়ার জন্য মাঝ রাস্তায় বাস থামানো। ইচ্ছাকৃত যানজট সৃষ্টি করাও নিয়মিত ঘটনা।

এসব রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা জানান, ‘বাসগুলোর যাত্রী তোলার জন্য প্রতিযোগিতায় পথচারী ও আমাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। এসব কিছু মেনেই চলতে হয়। আর সিটিং সার্ভিস শুধু নামেই। সব সময়ই সিটিং সার্ভিসে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে হয়। এয়ারপোর্ট বাসের যাত্রী আরিফ মাহবুব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী, বেপরোয়া চালনা ও বাসগুলোর একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা যাত্রীদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। মামুন নামের এক যাত্রী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বাসের সিটে বসার পর উঠতে গিয়ে প্যান্টের পকেট সিটের ভাঙা অংশে আটকে ছিঁড়ে গেছে। আরেক যাত্রীর অভিযোগ, বাসে ওঠার সময় চালক কিছুটা অপেক্ষা করলেও নামার সময় অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি থামানো হয় না। ফলে চলন্ত অবস্থাতেই যাত্রীদের নামতে বাধ্য করা হয়।

এদিকে নানা অভিযোগের সঙ্গে রয়েছে বাসের ফিটনেস নিয়ে চরম অসন্তোষ। এ বিষয়ে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর অধিকাংশ বাস চুক্তিভিত্তিক পরিচালিত হয়। একই বাস একেক দিন ভিন্ন ভিন্ন চালক চালান। ফলে বাসের রক্ষণাবেক্ষণ বা ফিটনেস নিয়ে কারো তেমন আগ্রহ থাকে না।

আজমেরী বাসের চালক সাচ্চু মিয়া বলেন, ‘বাসটি আজ আমি চালাইলে কাল আরেকজন চালায়, পরদিন অন্যজন। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ বা ফিটনেস ঠিক করতে কেউ তাগিদ দেয় না।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ফিটনেস ইস্যুতে আমাদের কোনো আপস নেই। প্রতিদিনই আইন ভঙ্গের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদার চাপে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা : পরিবহন শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন মালিককে একটি বাসের জন্য প্রায় ৩ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। এ ছাড়া জ¦ালানি, সহকারী ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দিনে আরও প্রায় ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এরপর অতিরিক্ত যা আয় হয়, সেটিই চালক ও হেলপারের উপার্জন। শ্রমিকদের অভিযোগ, আয়ের একটি বড় অংশ নিয়মিত বিভিন্ন খাতে চাঁদা হিসেবে চলে যায়। কোথাও মাসিক ভিত্তিতে, কোথাও প্রতিনিয়ত টাকা দিতে হয়। ফলে বেশি যাত্রী তোলার জন্য অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

তবে গাড়ির ফিটনেসের বিষয়ে অভিযোগের তির বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের দিকে। পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, রুট পারমিটবিহীন এবং দৃশ্যত আনফিট বাসগুলো জব্দ করতে ট্রাফিক বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে। বাসের ফিটনেস না থাকলে সেটিকে সড়কে চলতে দেওয়ার সুযোগ নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্ধারিত স্টপেজ থাকলেও সেই স্থানে কোনো বাসই থামে না। রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা চলছে দিনের পর দিন। একজন বা দুজন যাত্রীর জন্য বাসগুলো আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে রাস্তার মাঝখানে। ফলে পেছনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। রাজধানীর কাকরাইল, মালিবাগ, রেলগেট, সাতরাস্তা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, একের পর এক বাস রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে, সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। অথচ সেখানে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশকে অনেক সময় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না।

দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অত্যন্ত কম। একজন সার্জেন্ট ও একজন কনস্টেবল দিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ফিটনেসবিহীন সব বাস একসঙ্গে ডাম্পিং করলে নগরীর পরিবহনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। অনেক বাসের বিরুদ্ধে ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে, জরিমানা দিয়ে তারা আবারও সড়কে নেমে পড়ছে। রাতারাতি পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাজধানীকে করছে স্থবির : রাজধানীর আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, ধানম-ি, শ্যামলি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, গুলিস্তান, পল্টন, শান্তিনগর, মালিবাগ, মগবাজার ঘুরে দেখা যায় অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল। প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল থমকে দেয় যান চলাচল। 

মিরপুর লিংকের চালক বলেন, অটোরিকশাগুলো হঠাৎ সামনে চলে আসে। প্রধান সড়কগুলো এখন তাদের দখলে বাসসহ সব গাড়ি ঠিকমতো চলতে পারে না এগুলোর জন্য। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, বাস ছেড়ে অটো চালাতে হবে।

 এদিকে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৬৯০টি নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস নামানোর অনুমোদন দেওয়া হলেও এখনো সেগুলোর দেখা মেলেনি। বর্তমান সরকার বৈদ্যুতিক বাস চালুর ওপর জোর দিচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এবং অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে না তুললে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের দাবি করছে। কিন্তু রাজধানীর সড়কের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ফিটনেসবিহীন বাস, রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশা, দুর্বল তদারকি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতিতে প্রতিদিনই বাড়ছে ভোগান্তি।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদের অভিযোগ, মেগা প্রকল্পের দিকে বেশি নজর দেওয়া হলেও রাজধানীর প্রাণ গণপরিবহন বাসসেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, মেট্রোরেল বা মনোরেল নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাসসেবার উপযোগিতা ও মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায় না।

ঢাকার ১২০টি স্থান প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা : বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম’ চালু হয়েছে। তবে যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং অবৈধ অটোরিকশা চলাচল বন্ধ না হওয়ায় এই আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

এদিকে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে ঢাকার ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বাস্তবায়ন কার্যক্রমে ডিএমপির সঙ্গে যুক্ত থাকবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ডিএমপির সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। প্রধান সড়কগুলোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করতে ধাপে ধাপে এই আধুনিকায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এর আগে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হয়। দেশীয় প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এসব সিগন্যাল বাতি তৈরি করে। বাতিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ম্যানুয়ালিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সিগন্যাল স্থাপনের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ এবং পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।

চলতি বছরের ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এসব ট্রাফিক পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে ডিএমপি। এআইভিত্তিক ক্যামেরায় সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ লঙ্ঘন শনাক্ত করার সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে। পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা এবং যান চলাচল ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।