ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েন ও আত্মগোপনে চলে যান। তবে দীর্ঘ নীরবতা ও আত্মগোপন ভেঙে সিলেটে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি নগরীতে দলটির আকস্মিক ঝটিকা মিছিল ও শোডাউন সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তবে রাজপথে নামার এই চেষ্টা করতে গিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের পড়তে হচ্ছে কঠোর আইনি বাধার মুখে। চলছে মামলা ও ধরপাকড়।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, সামনে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা আরও জোরেশোরে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতেই মূলত দূর থেকে আসা নির্দেশনায় এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ঐক্যের মাধ্যমে দলটির প্রকাশ্য কার্যক্রম সীমিত আকারে শুরু করার চেষ্টা চলছে।
মাঠ পর্যায়ে কর্মীরা রাজপথে নামার চেষ্টা করলেও সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কেউই বর্তমানে দেশে নেই। দলীয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দলের প্রথম সারির সব নেতাই বিদেশে অবস্থান করছেন। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন এবং সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান রয়েছেন ভারতে। অন্যদিকে, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ যুক্তরাজ্যে এবং সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন ভারতের করিমগঞ্জে অবস্থান করছেন।
সম্প্রতি সিলেটে আওয়ামী লীগ ও এর নিষিদ্ধঘোষিত অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে আকস্মিক শোডাউন দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মহানগরীর নবাব রোড এলাকার পিডিবি অফিসের সামনে থেকে মদিনা মার্কেটের দিকে প্রায় ৪০-৫০ জন নেতাকর্মী নিয়ে একটি ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। ভারতের করিমগঞ্জে অবস্থানরত সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খানের উদ্যোগে এই কর্মসূচি আয়োজন করা হয় বলে জানা গেছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এই মিছিলের পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মিছিলস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চারজন এবং পরে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেনÑ ইব্রাহিম মোস্তফা মাহী, সানিয়াত আহমদ, রেদুয়ান আহমদ রাব্বী, আশরাফুল আহমদ শাহী, সাকির আহমদ এবং সর্বশেষ বন্দরবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ফুয়াদ আহমদ (৩২)। গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য।
এই ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার কোতোয়ালি থানার এসআই মাসুদ আহমদ বাদী হয়ে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪০-৪৫ জনকে আসামি করে মোট ৬৯ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ (সংশোধিত)-এর বিভিন্ন ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-২৬(০৬)২০২৬) দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার ওসি খান মো. মাইনুল জাকির জানান, এ পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, তাদের যেকোনো তৎপরতা রুখে দিতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনকে মাঠে নামতে দেওয়া হবে না।
এদিকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের এই ঝটিকা মিছিলের প্রতিবাদে এবং স্বৈরাচারী শক্তির যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে রুখে দিতে মাঠে নেমেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন। গত বুধবার রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানের নির্দেশনায় সিলেট মহানগরীর শিবগঞ্জ এলাকা থেকে একটি বিশাল প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।
মিছিলটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিলাগড়ে গিয়ে এক বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে বক্তারা অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সিলেটের পবিত্র মাটিতে নিষিদ্ধঘোষিত কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের জায়গা হবে না। খুনি হাসিনার প্রেতাত্মারা ঝটিকা মিছিল করে বর্তমান সরকারকে ভয় দেখাতে চাইলে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাজপথে অতন্দ্র প্রহরীর মতো প্রস্তুত রয়েছে।
রাজনৈতিক সূত্র জানায়, যদিও পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তীব্র নজরদারি এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার কারণে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য কার্যক্রম সীমিত ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তবুও আসন্ন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে সামনে রেখে দলটির অঙ্গসংগঠনগুলো গোপনীয়তা ভেঙে সিলেটে আরও বড় ধরনের শোডাউন বা ঝটিকা কর্মসূচি করার চেষ্টা চালাতে পারেÑ এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।

