দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, শিল্পশিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ‘পাপেট ম্যান’ হিসেবে পরিচিত মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও নিউমোনিয়াজনিত সংক্রমণে ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। জনপ্রিয় এই শিল্পব্যক্তিত্বের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন তার ভাগ্নে জুলফিকার রহমান ও ভাগ্নি অভিনেত্রী নিমা রহমান।
শিল্পীর পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ প্রথমে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে নেওয়া হবে। সেখানে প্রথম জানাজা শেষে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে মরদেহ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা হবে। এরপর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে শিল্পীকে। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেলে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে তাকে।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রমুখ।
এক শোকবার্তায় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেটশিল্প, নাটক ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ, শিশুদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও সৃজনশীলতা চর্চায় তার অনন্য অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার শোকবার্তায় বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতি তার অবদানকে সর্বদা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তারেক রহমান মরহুমের আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি চিত্রকলা, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল চর্চায় যে অনন্য অবদান রেখে গেছেন, তা জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার সৃষ্টিকর্ম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরদিন অনুপ্রাণিত করবে। তিনি মুস্তাফা মনোয়ারের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
আরেক শোকবার্তায় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের বিদায়ে শিল্পের একটি আলোকিত অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তার মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান রেজাউদ্দিন স্টালিন।
মুস্তাফা মনোয়ারের পরিবার জানায়, কয়েক বছর ধরেই বরেণ্য এই শিল্পী বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সম্প্রতি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে গত ১৪ জুন স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরে তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। প্রোস্টেট ক্যানসারসহ নানা জটিলতাও ছিল তার। মৃত্যুর পর গতকাল দুপুরে ধানম-ির তাকওয়া মসজিদে গোসল সম্পন্নের পর মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ তার ধানম-ির বাসভবনে নেওয়া হয়। সেখানে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ সংরক্ষণের জন্য স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে মাগুরার নাকোল গ্রাম ও যশোরের শ্রীপুরের উল্লেখ থাকলেও তার পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান।
ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী মুস্তাফা মনোয়ার ভাষা আন্দোলনের সময় কার্টুন আঁকার কারণে কারাবরণ করেন। পরে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৬৫ সালে চারুকলার চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন এবং টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, পাপেট্রি ও ভিজুয়াল আর্টে নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এ গুণী শিল্পী।
চিত্রকলা, পাপেট্রি, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ ও শিশু-কিশোরদের জন্য সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন। তার কাজ বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মের শিশুদের সমৃদ্ধ করেছে। ২০০২ সালে চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশু কেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন এই গুণী শিল্পী। শিল্পকলায় অনবদ্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি। ২০১৩ সালে জাপান প্রবাসীদের সংগঠন ‘প্রবাস প্রজন্মে জাপান’ থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন। ২০১৯ সালে লাভ করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত ‘সুলতান স্বর্ণ পদক-২০১৮’।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন