রাজধানীর আদাবরে বিএনপি নেতা আবুল বাশারকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেনÑ রিপন, নিরব, মজনু মিয়া ও মো. মিজানুর রহমান। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার সাহেবনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম।
গতকাল শুক্রবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার এন এম নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় ডিবির তেজগাঁও বিভাগ আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার সাহেবনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় হত্যাকা-ে ব্যবহৃত একটি সুইচ গিয়ার চাকু উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে ডিবি। এর আগে এ ঘটনায় নবোদয় হাউজিং এলাকা থেকে শোয়েব, আরমান ও নয়ন নামে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বিশ^কাপ খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আদাবর এলাকায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে বিএনপির নবোদয় হাউজিং ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় ইউনিটটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন গুরুতর আহত হন। যদিও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, হত্যাকা-ের এক দিন আগেও সাদ্দাম হোসেনের ওপর হামলা হয়েছিল। সে ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, নবোদয় কাঁচাবাজার ও আশপাশ এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মিরাজের রাজনৈতিক কার্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বাজারের ফুটপাত, বিভিন্ন গ্যারেজ ও মাদকের স্পট থেকে কথিত সমিতির নামে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে রিপনের বিরুদ্ধে। তার নেতৃত্বে একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় বলে স্থানীয়দের দাবি। এসব কর্মকা-ে বাধা দিলেই হামলার শিকার হতে হয়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
আদাবরের নবোদয় হাউজিং ইউনিটের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার ও সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের ওপর হামলার নেপথ্যে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা জড়িত। তাদের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা মাসুম এ হামলার নেতৃত্ব দেন। মাসুমের সঙ্গে তার ভাই রবিন ও নাহিদ ছিল। এ ছাড়া রিপন, নিরব, পারভেজ, মজনু, সুমন ও শহিদ সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হামলার নেপথ্যে থাকা মাসুমের নামে একাধিক হত্যা মামলাসহ অনেক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও আদাবরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় যুবদল নেতা সজীব আহমদ রানার সঙ্গে প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে তাকে দেখা যায়। এ ছাড়া স্থানীয় কিশোর গ্যাং চক্রের মূল হোতা হিসেবে সে পরিচিত।
নবোদয় কাঁচাবাজার এলাকায় ভ্যানের সবজির দোকান ও ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে কথিত সমিতির নামে চাঁদা তোলা হয়। এ চাঁদার টাকা স্থানীয় ১০০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিরাজ ও রিপন আদায় করেন। ফুটপাত থেকে এ চাঁদা তোলা নিয়ে এর আগে কয়েক দফায় মিরাজের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাগবিত-ার ঘটনা ঘটে।
আহত সাদ্দাম হোসেনের মা কোকিলা খাতুন বলেন, আমার সন্তানকে যারা কুপিয়ে আহত করেছে, তাদের শাস্তি চাই। ঘটনায় এখনো আমরা মামলা করিনি। তবে আমরা মামলা করব। কাউকে ছাড় দেব না। হয়তো মামলা করার পর আমার ওপর কিংবা আমার স্বজনদের ওপর আবারও হামলা হতে পারে। যদি প্রশাসন তাদের ছেড়ে দেয়, তাহলে আইনের প্রতি আর কোনো শ্রদ্ধা থাকবে না।
নিহত আবুল বাশারের বড় ভাই সবুজ মিয়া বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। আবুল বাশার একটি সালিশ বৈঠকে গিয়েছিলেন। সেখানে খেলা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা করে ফেরার পথে ৮ থেকে ১০ জন তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আবুল বাশার ও সাদ্দাম গুরুতর আহত হন।
আদাবর থানা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাবিব হাসান বলেন, গত সোমবার রাতে জাপান-ব্রাজিল ফুটবল খেলার দিন আমার বাসার সামনে রিপনের ভাই নিরব এসে উচ্চশব্দে ঢোল বাজাচ্ছিল। আমি হার্টের রোগী। প্রথমে আমি তাকে উচ্চশব্দে ঢোল বাজাতে নিষেধ করলে তারা কয়েকজন মিলে আরও জোরে ঢোল বাজাতে থাকে। পরে আমি নিরবকে ডেকে একটি থাপ্পড় দিই। এ ঘটনার পর নিরবের ভাই রিপন আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে কোপানোর জন্য খুঁজতে থাকে। বিষয়টি আমার ভাগনে সাদ্দাম হোসেন জানতে পেরে তাদের ডেকে সাবধান করে দেয়। ওই সময় তারা সাদ্দামের ওপর চড়াও হয়ে তাকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়। এ ঘটনার পর সাদ্দাম প্রথমে আদাবর থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ আসে। কিন্তু বিএনপি নেতা মিরাজ ঘটনাস্থল মোহাম্মদপুর থানার আওতাভুক্ত বলে পুলিশকে জানায়। পরে এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানায় অভিযোগ দিতে বলা হলে সেখানে সাদ্দাম একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা না হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার জন্য আমরা বসি।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে নবোদয় হাউজিং এলাকায় বসার পর মীমাংসা করে দুই পক্ষকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মীমাংসার পর সাদ্দাম বের হয়ে রাস্তায় যাওয়া মাত্রই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওত পেতে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তার ওপর এবং ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাশার মিয়ার ওপর হামলা করে। তাদের গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাদ্দাম হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাশার মিয়া এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনাগুলো মূলত এক দিনের নয়। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ঘটনারই বহিঃপ্রকাশ এগুলো। নবোদয় বাজারে ফুটপাত ও সবজির দোকানে সমিতির নামে চাঁদা তোলাসহ নানা ঘটনা নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল চলছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ এ হত্যাকা-।
বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলেন, নবোদয় কাঁচাবাজার ও আশপাশে চাঁদাবাজি, ময়লা বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতা মিরাজ। তার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এসব ঘটনা ঘটেছে। মূলত বিএনপির কমিটিতে মিরাজ কোনোভাবেই দলীয় পদ পাওয়ার যোগ্য নন। তিনি কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজ চক্র লালন-পালন করেন। এ কারণে তাকে দলীয় সভা-সমাবেশে কাজে লাগাতে পদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলেই স্থানীয় বিএনপির মধ্যে অন্তর্কোন্দল দেখা দিয়েছে। তবে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো আইনি সহায়তা না পাওয়ার ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা ও আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শনাক্ত করে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে, আবুল বাশারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার সোয়েব হোসেন সোয়াইব ও মো. কবির নামে দুইজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথির আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে, সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাদের আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন আদাবর থানার এসআই মো. হাফিজুর রহমান। আবেদনে বলা হয়, আসামিরা এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত আছে- প্রাথমিক তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে আরও গভীর ও নিবিড় তদন্ত অব্যাহত আছে। গভীর তদন্তকালে যদি আসামিরা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত আছে এমন সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ওই হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হবে। তদন্ত সমাপ্ত, নাম-ঠিকানা যাচাই ও বাদীর এজাহার না পাওয়া পর্যন্ত আসামিদের কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবী মো. মাহবুব আলম জামিন চেয়ে প্রার্থনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত আসামিদের জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, আজ দুই আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আগামি পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে পুলিশকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আসামিদের জামিনের বিষয়ে শুনানি হবে।
৫ মাসে ঢাকায় ৯৪ হত্যাকা- : শুধু রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, বিভিন্ন কারণে রাজধানীতে খুন-খারাবির ঘটনা এমনিতে অহরহ ঘটছে। খোদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজধানীতে সব মিলিয়ে ৯৪টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি এবং মে মাসে ১৬টি হত্যাকা- ঘটেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন