সরকারি খাতায় নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিসিক উদ্যোক্তা মেলা ও ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলন-২০২৬’। মূল লক্ষ্য ছিল, দেশীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশ ও ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের সরাসরি সংযোগ ঘটানো। তবে সিলেটের বাস্তবচিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। মেলা আয়োজনের মূল লক্ষ্যকে আড়াল করে এটিকে রীতিমতো বাণিজ্যিক মেলায় পরিণত করেছিলেন আয়োজকরা। নিজেদের পকেট ভারী করার হীন উদ্দেশ্যে প্রকৃত ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কোণঠাসা করে সেখানে টাকার বিনিময়ে বসানো হয় ব্যবসায়ীদের। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে মেলার নামে ১৩ দিনে লোপাট করা হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
সিলেট শহরের রিকাবি বাজারে অবস্থিত মোহাম্মদ আলী জিমনেসিয়ামে আয়োজন করা হয়েছিল এই মেলা ও ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলনের। গত রোববার শেষ হয় এই আয়োজন। জানা গেছে, এই আয়োজন ঘিরে প্রতিদিন অন্তত তিন লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে। হিসাব অনুসারে প্রায় দুই সপ্তাহে অন্তত অর্ধকোটি টাকার পুরোটাই গেছে বিসিকের শীর্ষ কর্মকর্তা, সিলেট জেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু প্রতিনিধি এবং মাঠপর্যায়ের একটি দালাল চক্রের পকেটে।
গত ২২ জুন জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই মেলায় জালিয়াতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে। জানা গেছে, সরকারের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে উদ্যোক্তা মেলার নামে মূলত একটি বাণিজ্যিক মেলা বসিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। মেলাটি উদ্বোধন করেন সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গত ৪ জুলাই মেলা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আয়োজকরা নিজেদের পকেট ভারী করতে সিলেট জেলা প্রশাসনের মৌখিক সম্মতিতে মেয়াদ আরও একদিন বাড়িয়ে ৫ জুলাই পর্যন্ত এটি পরিচালনা করেন। উদ্বোধনের পর থেকে এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার গেট ও সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের মূল ফটক পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় মেলার পরিসর।
মেলা চলাকালে এখানে আসা একাধিক ক্রেতার সঙ্গে কথা বললে তারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা সুমি আক্তার ও মীরাবাজারের জাহিদ হাসান জানান, এটি কোনোভাবেই উদ্যোক্তা মেলা মনে হয়নি। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কসমেটিকস, প্লাস্টিক পণ্য ও কাপড়ের বাণিজ্যিক পসরা সাজিয়ে বসেছেন বড় ব্যবসায়ীরা, যা সাধারণ যেকোনো বাণিজ্যমেলায় দেখা যায়। মেলার পরিবেশ ঘিঞ্জি ও অস্বস্তিকর। স্টলগুলোতে পণ্যের মূল্য সাধারণ বাজারের চেয়ে অনেক বেশি। উদ্যোক্তাদের মেলা বলে যে ছাড় বা নতুনত্বের আশা নিয়ে তারা এসেছিলেন, তার কিছুই এখানে পাননি। বরং বিনোদন রাইড আর খাবারের দোকানের চড়া দামে সাধারণ ক্রেতারা এক প্রকার প্রতারিত হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেলার একাধিক স্টল মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার নির্ধারিত দৈনিক ৫৫০ টাকার সুবিধার কথা তারা জানতেন না। মাঠপর্যায়ের দালালদের মাধ্যমে দৈনিক তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা নগদ ভাড়ার চুক্তিতে তারা দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেন, মেলা কমিটির লোকজনকে প্রতিদিন নগদ অর্থ না দিলে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। এত উচ্চ মূল্যে দোকান ভাড়া নেওয়ার কারণে বাধ্য হয়েই পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে ক্রেতাদের সঙ্গেও প্রতিদিন কথা-কাটাকাটি হয়েছে। সরকারি এই আয়োজনটি মূলত কিছু মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল ও কর্মকর্তার পকেট ভারী করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল বলে তারা মন্তব্য করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং সিলেট জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই মেলার আয়োজন করা হয়। সরকারি বিধি মোতাবেক মেলায় মাত্র ৩২টি স্টল বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল, যার বিপরীতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা দৈনিক ৫৫০ টাকা হারে সরকারি রাজস্ব খাতে অর্থ জমা দেন। কিন্তু মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে এবং মাঠপর্যায়ের তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি তালিকার বাইরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে আরও প্রায় ১৫০টি ছোট-বড় দোকান বসানো হয়। এসব দোকান থেকে দৈনিক দুই হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া হিসাবে নগদ টাকা আদায় করা হয়, যার কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। আর এই বিশাল অঙ্কের টাকার একটি পয়সাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। শুধু বড় দোকানই নয়, মেলা প্রাঙ্গণের ফুটপাতে বসা ভাসমান দোকান থেকেও প্রতিদিন ২০০ টাকা এবং প্রতিটি চটপটির দোকান থেকে ১০ হাজার টাকা করে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রতি রাতে মেলা শেষে রাত ৯টায় বিসিকের অস্থায়ী কার্যালয়ে বসে কর্মকর্তা, প্রশাসনের প্রতিনিধি ও দালালরা মিলে এই টাকা ভাগ করে নিতেন, যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিলেট বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. সোহেল হাওলাদার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর যাতে প্রকাশ না পায়, সেজন্য গণমাধ্যম ম্যানেজ করতে একটি জাতীয় গণমাধ্যমের সিলেট প্রতিনিধির হাতে এক লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়।
মেলার এই বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ঢাকা থেকে আসা একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর একচ্ছত্র আধিপত্য। ওই ব্যবসায়ী একাই মেলায় ২৫টি স্টল এবং বিনোদনের জন্য ‘নৌকা রাইড’ ও ‘দোলনা’ স্থাপন করেন। তিনি এই ২৫টি স্টলের জন্য প্রতিদিন ৬০ হাজার এবং বিনোদন রাইডগুলোর জন্য ৩০ হাজার টাকা মেলা কমিটিকে প্রদান করতেন। এ ছাড়া মেলায় প্রতিদিন আলোচনা সভা ও সেমিনার আয়োজনের জন্য যে মূল মঞ্চ বা স্টেজ তৈরি করা হয়েছিল, টাকার লোভে আয়োজকরা সেই স্টেজটিও ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেন। পরে দেখা যায়, নিয়মনীতি ভেঙে ওই স্টেজের সামনে পর্দা টাঙিয়ে আরও দুটি স্টল তৈরি করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা তোলার জন্য মাঠপর্যায়ে চারজন দালাল নিয়োগ করা হয়েছিল, যাদের প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা করে কমিশন দেওয়া হতো। এছাড়া শাহপরান এলাকার আহমদ ফেরদৌস নামে বিএনপির এক কর্মী কোনো অফিসিয়াল দায়িত্বে না থাকলেও প্রতিদিন মেলা অফিসে বসে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতেন এবং দলের নামে নিয়মিত বখরা নিয়ে যেতেনÑ এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. সোহেল হাওলাদার সবধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, মেলার স্টল বরাদ্দে কোনো জালিয়াতি হয়নি। নিয়মের ভেতরে থেকে সবকিছু করা হয়েছে। মেলায় কোনো বহিরাগত ব্যবসায়ী ছিলেন না, বরং সবাই ছিলেন প্রকৃত উদ্যোক্তা। মেলার মূল স্টেজে কোনো পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান না থাকায় সেখানে সাময়িকভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বসতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও জানান, সিলেট জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (সার্বিক) সরাসরি নির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে মেলা পরিচালিত হয়েছে। তার পরামর্শেই মেলার মেয়াদ একদিন বাড়ানো হয়েছিল।
তবে সিলেট জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইদা পারভিন জানান, সময় বাড়ানোর কোনো অনুমতি তারা দেননি। আয়োজক বিসিক সেটি করেছে। তিনি বলেন, মেলায় অফিসিয়ালি ৩২ উদ্যোক্তা স্টল থাকলেও আমাদের জানানো হয়েছে সেখানে সব মিলিয়ে ৭২টি স্টল বসেছে। এর হিসাব আমরা পাইনি। এর জন্য তাদের ডেকেছি। তার দাবি, বিসিক শিল্প মেলার নামে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকলে সেখানে তার দপ্তরের কেউ জড়িত নয়। কেউ বলে থাকলে তারা নিজেদের গা বাঁচানোর জন্য বলতে পারে।

