অর্থবছর শুরু হলেও এখনো করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের কার্যক্রম শুরু হয়নি। বিদায়ী অর্থবছরে পাঁচ শ্রেণি ব্যতিত ব্যক্তি করদাতার অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
চলতি অর্থবছর থেকে ব্যক্তি করদাতার পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানেরও অনলাইনে রিটার্ন দাখিল চালু করার কথা রয়েছে। প্রথমবারের মতো অনলাইনে করপোরেট রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম শুরুতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তবে চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে ব্যক্তি করদাতাদার অনলাইনে রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অনলাইনে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে এ বছর আগাম রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রণোদনা চালু করায় যত দ্রুত সম্ভব, আমরা এটি শুরু করতে চাই। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি।
অনলাইন রিটার্ন দাখিল কার্যক্রমে সফটওয়্যার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সিনোসিস আইটির চিফ সলিউশন অফিসার (সিএসও) বলেন, আয়কর আইনে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে তার আলোকে সফটওয়্যারেও আপগ্রেডেশন করতে হচ্ছে। আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে আপগ্রেডেশনসহ এনবিআরকে হস্তান্তর করা হবে। এরপর এনবিআর এটি পর্যালোচনা করবে।
অপরদিকে করপোরেট রিটার্নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এনবিআরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় চাহিদা দেওয়া হচ্ছে। সে অনুযায়ী, সফটওয়্যার ডেভেলপন্টের কাজ করতে হবে। যেহেতু এটি নতুন ডেভেলপমেন্ট সেজন্য কিছুটা সময় লাগবে। কবে নাগাদ এটি সম্পন্ন হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দিনক্ষণ সম্পর্কে এখনই স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে বলে জানান তিনি।
এদিকে চলতি করবর্ষ থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে করদাতারা যাতে ব্যাংকের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নে যুক্ত করতে পারেন সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে এনবিআর। এটি বাস্তবায়ন হলে করদাতাকে আলাদাভাবে ব্যাংকের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে না। তবে এটি বাধ্যতামূলক করা হবে না বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান।
তারা বলেন, করদাতা যদি স্বেচ্ছায় ব্যাংকের তথ্য রিটার্নে যদি দিতে চান, দিতে পারবেন। আবার না দিতে চাইলে ম্যানুয়ালি সেটি রিটার্নে দিতে পারবেন। কোনো কারদাতা যদি তার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে না দিয়ে কয়েকটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের তথ্য দিতে চান সেটিও করতে পারবেন। তবে যেসব করদাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য দিতে চাইবেন না, তারা নিরীক্ষা ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকের চারটি তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। এগুলো হচ্ছে- ২০২৬ সালের ৩০ জুন অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স, সুদ থেকে আয়, সুদের আয় থেকে কর্তিত উৎসে কর এবং সার্ভিস চার্জ বাবদ কর্তিত অর্থ।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এনবিআরের সঙ্গে জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অ্যাপ্লিকেশন প্রোগামিং ইন্টারফেস (এপিআই) রয়েছে। ফলে কোনো করদাতা সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে থাকলে কিংবা গাড়ির মালিকানা থাকলে তার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নে যুক্ত হয়। তবে আগামীতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে এপিআই করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এনবিআরের প্রথম সচিব পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নে যুক্ত করা গেলে কর ফাঁকির পরিমাণ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়বে।
চলতি করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার রিটার্ন দাখিলে ব্যক্তি করদাতা ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের আয়কর রিটার্ন দাখিলে পুরো করবর্ষকে ৪টি ভাগে বিভক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
নতুন বিধান অনুযায়ী, ব্যক্তি শ্রেণির করদাতা যদি ২০২৫-২৬ আয়বর্ষের রিটার্ন চলতি করবর্ষের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাখিল করেন তাহলে তিনি করছাড় সুবিধা পাবেন। এ সময়ে যিনি আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন তিনি আদায়যোগ্য করের ৫ শতাংশ কিংবা ২৫ হাজার মধ্যে যেটি কম; সেটি পাবেন। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব ব্যক্তি করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন তারা নিয়মিত করদাতা হিসাবে বিবেচিত হবেন। এ সময়ে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন তারা করছাড় সুবিধা যেমন পাবেন না, তেমনি জরিমানাও গুনতে হবে না।
তবে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ সময়ে যেসব করদাতা রিটার্ন দাখিল করবেন তাদের জরিমানা গুনতে হবে। জরিমানার পরিমাণ হবে আদায়যোগ্য করের ২ শতাংশ কিংবা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ। সর্বশেষ ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলকারীকে আদায়যোগ্য করের ৫ শতাংশ কিংবা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ তা পরিশোধ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য আগেও জরিমানার বিধান ছিল। বিলম্বের জন্য ১ হাজার টাকা এবং প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা হারে জরিমানা ধার্য করাছিল।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে ৪০ লাখের বেশি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করেছেন। অনলাইন রিটার্ন দাখিলকারীর বড় অংশই শূন্য রিটার্ন দাখিল করেছেন। অর্থাৎ তারা রিটার্ন দাখিল করলেও কোনো কর দেননি। তারা তাদের আয়কে করমুক্ত সীমার নিচে দেখিয়েছেন। বিগত করবর্ষে করমুক্ত আয় সীমা ছিল সাড়ে ৩ লাখ। চলতি করবর্ষে ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ করা হয়েছে।
৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক ব্যতীত সব ব্যক্তি-শ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করে এনবিআর।

