ইউরোপীয় দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ। ইউরোপের দেশগুলোর আমদানি চাহিদা কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরে ৮.৯৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে ১৮.৮৯ শতাংশ কমে ৭.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। বাংলাদেশ থেকে মোট পোশাক আমদানি আগের বছর ২৩.৯ শতাংশ থেকে কমে ২১.৫ শতাংশ হয়েছে।
ইউরোপে পোশাকের চাহিদা কমার পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ইইউর মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৯৬ শতাংশ কমে ৩৩.৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ইউরো।
তবে বাংলাদেশ থেকে তাদের আমদানি কমেছে আরও বেশি। বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির পরিমাণ আগের বছরের ৮.৯৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে ১৮.৮৯ শতাংশ কমে ৭.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা আগের বছরের ২৩.৯ শতাংশ থেকে কমে ২১.৫ শতাংশ হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে চীন থেকে ইউরোপের আমদানি কমেছে ৪.২০ শতাংশ, ভিয়েতনাম থেকে ১.৫১ শতাংশ, ভারত থেকে ১৩.৩৩ শতাংশ ও তুরস্ক থেকে কমেছে ১৫.৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ এই দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে ভালো করেছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার রপ্তানি কমেছে ১০.৭৭ শতাংশ ও পাকিস্তানের কমেছে ১৭.০১ শতাংশ।
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পরিসংখ্যান। রপ্তানিকারকদের এখন শুধু দুর্বল ভোক্তা চাহিদাই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর শক্ত প্রতিযোগিতারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের আগে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ধীরে ধীরে তাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন আনছে। তিনি বলেন, ইউরোপের বড় অংশজুড়েই রপ্তানি কমেছে। ক্রেতারা ধীরে ধীরে ভারতে সোর্সিং সক্ষমতা তৈরি করছে। কারণ তারা ধারণা করছে, ভারত আগামীতেও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে, অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে শুল্কের মুখে পড়তে হতে পারে। হাতেম আরও বলেন, বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা শেষ হওয়ার অনেক আগে থেকেই ক্রেতারা বিকল্প সোর্সিং ভিত্তি তৈরি করতে শুরু করেছে।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, ভিয়েতনামের রপ্তানি বেশি কমার মূলে রয়েছে শিল্পের কাঠামোগত পার্থক্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া এখনো তুলাভিত্তিক পোশাকের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীরা কৃত্রিম (ম্যান-মেইড) ফাইবার দিয়ে তৈরি পণ্যে নিজেদের সক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে। কৃত্রিম ফাইবারের পণ্যের চাহিদা যখন বাড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ওই ধরনের অবকাঠামো থাকা দেশগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
জব্বার সতর্ক করে বলেন, নেট জিরো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা দেখাতে পারেনি। ফলে ভবিষ্যতের পণ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের মনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য মতে, পণ্যের দামের ওপরও ক্রমেই চাপ বাড়ছে। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের গড় রপ্তানিমূল্য আগের বছরের তুলনায় ৯.৪১ শতাংশ কমে প্রতি কেজিতে ১৩.৯৬ ইউরোতে নেমে এসেছে। একই সময় রপ্তানির পরিমাণও ১০.৪৬ শতাংশ কমে ৫২১.৩৭ মিলিয়ন কেজি হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন