মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের বাসুদেবপুর নার্সারির গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। যেদিকে চোখ পড়ে সেদিকে নার্সারি আর নার্সারি। বসতবাড়ির সামনে, পেছনে এবং ছাদেও ফলদ, বনজ ও রকমারি ফুলের চারা উৎপাদন হয়। গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষই নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ১৫ কোটি টাকার বেশি চারা বিক্রি হয়।
জানা গেছে, বাসুদেবপুরে বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা উৎপাদন হয়। বছরজুড়ে কয়েকশ নার্সারিতে ফুল, ফল, মসলাসহ হরেক রকমের গাছের চারার বেচাকেনা চলে। ৩৫৬টি নার্সারি ছাড়াও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে চারা উৎপাদন হয়। যশোর ও আশপাশের জেলাসহ সারা দেশে যায় এখানকার চারা। নার্সারি মালিকদের দেওয়া হিসেবমতে, শুধু বর্ষার তিন মাসে ১৫ কোটি টাকার ওপর চারা বিক্রি হয়। বছরজুড়ে চারা বিক্রি চললেও বর্ষা মৌসুমে সেটি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারার মধ্যে বাসুদেবপুরে লিচু চারা বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। দিনাজপুরের চাষিদের কাছে বাসুদেবপুরের লিচু চারার কদর অনেক।
নার্সারি বাসুদেবপুরের মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। গ্রামটিতে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেছে। নার্সারি ব্যবসা করে এখানকার বহু মানুষ সফল হয়েছেন। শূন্য থেকে কোটিপতিও হয়েছেন। লিজ নিয়ে নার্সারি গড়ে তুলে পরবর্তীতে জমি-বাড়ির মালিক হয়েছেন। তাদের দেখাদেখি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গড়ে উঠছে নার্সারি। বছরজুড়ে কোটি কোটি টাকার চারা বিক্রি হয় বাসুদেবপুরের কয়েকশ নার্সারিতে। নার্সারির গোড়াপত্তনকারী মোহাম্মদ আলী মেম্বার সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ চারা উৎপাদনকারী চাষি হিসেবে একবার পুরস্কারও পেয়েছেন। স্থানীয় নার্সারি মালিকদের দাবি, দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ লিচুর চারা উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। বষা মৌসুমেই ২০-২৫ লাখ টাকার লিচুর চারা চারা বিক্রি হয়। এ ছাড়াও সারা বছর এখানে লিচুর চারা বিক্রি হয়।
শত শত প্রজাতির দেশি প্রজাতির পাশাপাশি বিদেশি ফলের চারাও উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। এখানে স্ট্রবেরি, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, ড্রাগন, থাই পেয়ারসহ ৩০-৪০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা তৈরি হয়। এ ছাড়া দেশি প্রজাতির ফলের বেশির ভাগই নার্সারিগুলোয় পাওয়া যায়। বর্ষাকালীন তিন মাস এভাবে চারা বিক্রি হয়। প্যাকেটে রোপণ করা চারার পাশাপাশি টবে লাগানো ফুল-ফলের চারাও এখানে বিক্রি হয়। চুই, লবঙ্গ, তেজপাতা, দারুচিনি, গোলমরিচ, এলাচসহ বেশ কয়েক প্রজাতির মসলার চারার উৎপাদন ও বিক্রি হয় বাসুদেবপুরে। এসব মসলা গাছের একেকটি চারার দাম আকৃতিভেদে ১০০-২৫০ টাকা। মসলার এই চারাগুলোর মধ্যে গোলমরিচের চারা দাম একটু বেশি। একটি চারার দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। চারা উৎপাদনের জন্য ভারত থেকে মসলার বীজ আমদানি করেন নার্সারি মালিকেরা।
২২ বিঘা জমির ওপর করা নার্সারির মালিক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তার বাবার হাত দিয়ে এখানে নার্সারি ব্যবসায় প্রসার ঘটে। বারোমাস তারা সারা দেশে চারা সরবরাহ করেন। তবে বর্ষা মৌসুমে বেচাবিক্রি বেশি হয়। তিনি জানান, গত বছর ৪২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুম বাদেই সারা বছরে ৫-১০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করে থাকেন।
বাসুদেবপুর বাজার এলাকার এনামুল হক জানান, একতলা বাড়ির সঙ্গেই তিনি প্রায় এক একর জমিতে নার্সারি গড়ে তুলেছেন। বাড়িতে বসেই নারকেল, সুপারির চারা বিক্রি করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছেন। ঢাকায় ভালো বেতনে চাকরি করতেন। করোনা পরিস্থিতিতে চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে নার্সারির কাজ শুরু করেন।
নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান জানান, সারা গ্রামে ৩৬৫টিরও বেশি নার্সারি রয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যেক বাড়ির উঠোনে চারা আবাদ করেন সবাই। ছোট নার্সারিগুলোতে স্বাভাবিকভাবে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার টাকার বিক্রি হয়। প্রতি বছর চারা বিক্রি থেকে ১০ কোটি টাকার ওপর আর্থিক লেনদেন হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন