দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অবশেষে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আর সরকার গঠনের পরপরই রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি নিজেদের ঘরের দিকে নজর দিয়েছে দলটি। দলটিতে নতুন প্রজন্মের উপযোগী, আধুনিক, গতিশীল ও যুগের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে এর সাংগঠনিক কাঠামোতে এক বিশাল পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
দলের হাইকমান্ড সূত্রে জানা গেছে, এই রদবদল ও আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে যাচ্ছে এমন কিছু সিদ্ধান্ত, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ‘বড় চমক’ হিসেবে দেখা দেবে।
বিএনপিতে পরিবর্তনের হাওয়া
মূল দল থেকে শুরু করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন- সর্বস্তরেই এই পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা রাজপথে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের যেমন যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে তরুণ, মেধাবী ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন নতুন মুখদের নিয়ে আসা হচ্ছে নেতৃত্বের সামনের সারিতে।
তারুণ্যের প্রাধান্য ও আধুনিকায়ন- চমকের মূল ভিত্তি
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, এবার সাংগঠনিক পরিবর্তনের মূল দর্শন হচ্ছে ‘তারুণ্য ও মেধার সমন্বয়’। গতানুগতিক ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দলকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই এর মূল লক্ষ্য।
দলের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিতে অন্তত ৪০ শতাংশ তরুণ নেতৃত্বকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের মূল দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কমিটিতে স্থান দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও, কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে আধুনিক দল গঠন অসম্ভব।
স্থায়ী কমিটি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রদবদল
সবচেয়ে বড় চমক আসতে যাচ্ছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’ এবং কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ে। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা স্থায়ী কমিটির পদগুলো পূরণের পাশাপাশি প্রবীণ ও অসুস্থ নেতাদের সম্মানজনক স্থানে রেখে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও সক্রিয় নেতাদের স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় দপ্তর এবং বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদেও আমূল পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সেল, তথ্য ও প্রযুক্তি সেল এবং গবেষণা সেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক সেলে যুক্ত করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অভিজ্ঞ তরুণ শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের।
দলের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ‘পারফরম্যান্স মূল্যায়ন সেল’ গঠন করা হচ্ছে। এখন থেকে কেবল লবিং বা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, বরং কাজের পারফরম্যান্স এবং জনগণের সাথে সম্পৃক্ততার ওপর ভিত্তি করে নেতাদের পদোন্নতি দেওয়া হবে।
বিএনপি জনগণের ভাষা বোঝে সময়ের দাবি পূরণ করে
দলের এই বিশাল সাংগঠনিক রূপান্তর ও চমক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, বিএনপি সবসময়ই জনগণের ভাষা বোঝে এবং সময়ের দাবি পূরণ করে। আমরা দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আর সেই রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ সফল করতে হলে দলকেও আধুনিক করতে হবে। ‘আমাদের এবারের সাংগঠনিক পরিবর্তনের মূল চমক হবে মেধা ও তারুণ্যের বিকাশ। আমরা প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে যেমন শ্রদ্ধা করি, তেমনি তরুণদের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই। এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক গুণগত পরিবর্তন আনবে।’
তৃণমূল পুনর্গঠন ও ‘এক নেতা এক পদ’ নীতির কড়াকড়ি
কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি তৃণমূলের রাজনীতিতেও বড় ধাক্কা আসতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটিতে সম্মেলন না হওয়ায় যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাউন্সিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া, দলের দীর্ঘদিনের চর্চিত ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি এবার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের মন্ত্রী বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতারা দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন, যাতে তারা সরকারি কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন। ফলে দলের পদগুলোতে নতুন ও ডেডিকেটেড নেতাদের আসার পথ সুগম হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তটি দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে এবং এটিকে বিএনপির সাংগঠনিক চমকের অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
জনমুখী রাজনীতি ও সোশ্যাল মিডিয়া সেলের আধুনিকায়ন
বিএনপির নতুন এই সাংগঠনিক পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি স্তরের কমিটিতে ‘জনসংযোগ ও সামাজিক কল্যাণ’ নামে নতুন উপকমিটি গঠন করা হচ্ছে, যাদের মূল কাজ হবে জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধান করা। একই সাথে, প্রযুক্তির এই যুগে দলের প্রচার সেল ও সোশ্যাল মিডিয়া উইংকে সম্পূর্ণ প্রফেশনালদের দিয়ে সাজানো হচ্ছে। গুজব প্রতিরোধ, সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রচার এবং তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বুঝে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোর জন্য একটি আধুনিক ডিজিটাল হাব তৈরি করছে বিএনপি।
সর্বোপরি, সরকার গঠনের পর বিএনপির এই অভূতপূর্ব সাংগঠনিক পরিবর্তনের উদ্যোগ দলটিকে কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দলীয় পুনর্গঠন এবং সরকারের সাথে দলের সমন্বয় নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, ‘সরকার গঠনের পর আমাদের সামনে যেমন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি দলকে আগামী দিনের উপযোগী করে গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দলে কোনো নিষ্ক্রিয় বা সুবিধাবাদীদের স্থান হবে না। যারা বিগত দিনে রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে। একই সাথে, সময়ের প্রয়োজনে প্রযুক্তি ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় দক্ষ তরুণদের আমরা নেতৃত্বে নিয়ে আসছি। আমাদের এই সাংগঠনিক পরিবর্তন কোনো লোকদেখানো বিষয় নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত রূপান্তর। খুব শিগগির দেশবাসী এই চমক দেখতে পাবেন, যা বিএনপিকে আরও জনমুখী ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।’

