বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক মহীরুহ, যাকে কোনো একটি ভূখ-, কোনো একটি ধর্মীয় পরিচয় কিংবা কেবল সাহিত্যিক গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি একই সঙ্গে কবি, দার্শনিক, সংগীতস্রষ্টা, শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী এবং সর্বোপরি মানুষের কবি।
রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে বুঝতে হলে তার পূর্ববঙ্গ-অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। কারণ, যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা আজ বিশ্বকবি হিসেবে জানি, তার পূর্ণ বিকাশের পেছনে বর্তমান বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনবোধের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের জন্ম কলকাতার এক অভিজাত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পেয়েছিলেন নগরজীবনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষিত সংস্কৃতির পরিম-ল এবং পাশ্চাত্য ভাবধারার সংস্পর্শ। পিতার সঙ্গে তিনি হিমালয়ে গেছেন, ভারতের নানা অঞ্চলে ঘুরেছেন, এমনকি তরুণ বয়সে ইংল্যান্ডেও পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু এতসব অভিজ্ঞতার পরও তার ভেতরের মানুষটি যেন সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি।
সেই অসম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথের সত্যিকার পুনর্জন্ম ঘটে তখনই, যখন তিনি জমিদারি তদারকের কাজে এসে পৌঁছান শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের নদীবিধৌত বাংলায়।
পূর্ববঙ্গ তাকে শুধু নতুন দৃশ্য দেয়নি, দিয়েছে নতুন জীবনবোধ। পদ্মার বিশাল জলরাশি, কাশবনের দোলা, বর্ষার মেঘ, ভাটিয়ালি সুর, কৃষকের ঘাম, জেলের জীবনসংগ্রাম সব মিলিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বাংলার প্রকৃত আত্মাকে। এই বাংলায় মানুষ ছিল সহজ, অকৃত্রিম, হৃদয়বান। তাদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আশা-নিরাশা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাই তিনি জমিদার হয়েও প্রজাদের কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। তিনি দূর থেকে তাদের দেখেননি। তাদের জীবনকে অনুভব করেছিলেন নিজের ভেতরে।
পদ্মা নদীর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রায় আধ্যাত্মিক। তিনি দীর্ঘ সময় কাটাতেন নৌকায় বসে। নদীর বুকে ভেসে যেতে যেতে তিনি যেন মানুষের অন্তর্জগৎকে চিনেছিলেন। তার বহু বিখ্যাত কবিতা, গান ও ছোটগল্পের জন্ম এই সময়। ‘ছিন্নপত্র’-এর চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায়, কী গভীর আবেগে তিনি পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও মানুষকে অনুভব করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন গ্রামের মানুষের সরলতা, দারিদ্র্য, সংগ্রাম এবং অদ্ভুত জীবনশক্তির কথা। এই অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যকে নগরকেন্দ্রিক অভিজাত চেতনা থেকে মুক্ত করে এক বৃহত্তর মানবিক পরিসরে নিয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে যে গ্রামীণ বাংলার অসাধারণ জীবনচিত্র আমরা দেখি। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘সমাপ্তি’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দেনাপাওনা’ কিংবা ‘ছুটি’ এসবের পেছনে রয়েছে পূর্ববাংলার মানুষের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। তার গল্পের মানুষগুলো কল্পনার চরিত্র নয়। তারা জীবন্ত বাংলার প্রতিচ্ছবি। পূর্ববঙ্গ তাকে শিখিয়েছিল, সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উপাদান মানুষ এবং মানুষের হৃদয়।
শুধু সাহিত্য নয়, সংগীতেও এই পরিবর্তন ছিল স্পষ্ট। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি যে দেশাত্মবোধক গানগুলো লিখেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘ও আমার দেশের মাটি’ এসব গানের সুরে তিনি ব্যবহার করেছিলেন বাংলার নিজস্ব লোকসংগীতের ধারা। বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, সারিগান সবকিছুকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, বাংলার মানুষের আত্মায় পৌঁছাতে হলে বাংলার মাটির সুরকেই ধারণ করতে হবে।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো, তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, এই অভিযোগ একপাক্ষিক এবং অসম্পূর্ণ। তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার মূল চিন্তা ছিল মানুষের ঐক্য। তিনি কখনোই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিকে সমর্থন করেননি।
বঙ্গভঙ্গের সময় যখন চারদিকে বর্জন আন্দোলনের উত্তেজনা, তখন রবীন্দ্রনাথ মানুষের হৃদয়ের মিলনের কথা বলেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল ইংরেজবিরোধিতা দিয়ে জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক সম্পর্ক। তাই বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিনে তার উদ্যোগেই পালিত হয়েছিল রাখিবন্ধন উৎসব। তিনি নিজে মুসলমানদের হাতে রাখি পরিয়ে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন। তার কাছে হিন্দু-মুসলমান ছিল না দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়; ছিল একই দেশের দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা ও দূরত্বই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তিনি বলেছেন, আমরা পরস্পরকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে শিখিনি। এই আত্মসমালোচনার সাহস খুব কম মনীষীর ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, বাইরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের বিভেদই বেশি ভয়ংকর।
এই মানবতাবাদী চেতনার কারণেই রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের ইতিহাসে এত গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ববাংলা যখন পাকিস্তানের অংশ হয়, তখন ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট শুরু হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে দমনের চেষ্টা চালায়। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক।
ভাষা আন্দোলনে তার গান ও কবিতা বাঙালিকে সাহস জুগিয়েছে। ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রসংগীত ছিল প্রতিবাদের ভাষা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ‘আমার সোনার বাংলা’ হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ের গান। স্বাধীন বাংলাদেশ সেই গানকেই জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে। এটি নিছক একটি সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়ের ঘোষণা।
আমাদের জাতীয় সংগীতের প্রতিটি পঙ্?ক্তিতে বাংলাদেশের প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসিÑ এই উচ্চারণে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নেই। আছে মায়ের প্রতি সন্তানের চিরন্তন মমতা। এই গান বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, এটি আজ আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ।
বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। এখানে তিনি কেবল সাহিত্যিক নন। তিনি মুক্তচিন্তার প্রতীক, অসাম্প্রদায়িকতার কণ্ঠস্বর, মানবতার কবি। পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথ অনেকাংশে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাস তাকে আরও জীবন্ত ও রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের মানুষ যে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করে, তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মুক্তির কথা বলেন। তিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের চেয়ে মানবিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন। তার কাছে দেশপ্রেম মানে ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাম্যের চেতনা এবং আত্মিক মুক্তি।
আজকের পৃথিবীতে যখন ধর্মীয় বিভাজন, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ ক্রমশ বাড়ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি শিখিয়েছেন, সভ্যতার শক্তি বিভাজনে নয়, মিলনে। মানুষকে ছোট করে নয়, বড় করে দেখার মধ্যেই মানবতার জয়।
রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মাটি থেকে শুধু সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা নেননি; তিনি এখানকার মানুষের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের শক্তি। তাই ১৯২৬ সালে পূর্ববঙ্গ সফরে এসে তিনি বলেছিলেন, এখানকার মানুষ কর্মঠ, নিষ্ঠাবান এবং উদ্যমী। তার সেই পর্যবেক্ষণ আজও সত্য বলে মনে হয়। বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামী চরিত্র, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই উপলব্ধিকেই সত্য প্রমাণ করে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ। তাই শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি যে শিক্ষাদর্শ তুলে ধরেছিলেন, তার ভেতরেও ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ, মানবিকতা এবং মুক্তচিন্তার আহ্বান। এই দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথকে তাই কেবল অতীতের স্মৃতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি বর্তমানেরও প্রয়োজন, ভবিষ্যতেরও দিশারি। বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে তিনি এমনভাবে জড়িয়ে আছেন যে তাকে বাদ দিয়ে আমাদের আত্মপরিচয় সম্পূর্ণ হয় না।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই, মানবতার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই, আর ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। তাই রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবি নন; তিনি বাংলাদেশের আত্মার আত্মীয়, মাটি ও মানুষের কবি।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধ অবলম্বনে)

