ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সূর্যমুখী চাষে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৫:২২ এএম

সূর্যমুখীর বীজে ৪০-৪৫% লিনোলিক এসিড রয়েছে, তা ছাড়া এ তেলে ক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড নেই। হৃদরোগীদের জন্য সূর্যমুখীর তেল খুবই উপকারী। সূর্যমুখীর খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গাছ ও পুষ্পস্তবক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সূর্যমুখী তেলের উপকারিতা অনেক, যেমন এতে থাকা ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে আর্দ্র ও মসৃণ রাখে, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে বাঁচায় এবং কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে; এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, শরীরে শক্তি জোগায় এবং মানসিক চাপ কমাতে পারে, কারণ এতে ট্রিপটোফেন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে যা সেরোটোনিন উৎপাদনে সাহায্য করে। সূর্যমুখীর চাষ ব্যবস্থা নিয়ে বগুড়ার আদমদিঘি ইউনিয়নের উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মিঠু চন্দ্র অধিকারীর সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন

জমি নির্বাচন : সূর্যমুখী সাধারণত সব মাটিতেই জন্মে। তবে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

জাত পরিচিতি : এ পর্যন্ত বারি কর্তৃক ২টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যথা (১) কিরণী (ডিএস-১) এবং বারি সূর্যমুখী-২।

বপনের সময় : সূর্যমুখী সারা বছর চাষ করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ মাসে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। দেশের উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ সেন্টিগ্রেডের নিচে হলে ১০-১২ দিন পরে বীজ বপন করা উচিত। খরিফ-১ মৌসুমে জ্যৈষ্ঠ (মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মে) মাসেও এর চাষ করা যায়।

বপন পদ্ধতি ও বীজের হার : সূর্যমুখী বীজ সারিতে বুনতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার। এভাবে বুনলে প্রতি হেক্টরে (২৪৭ শতকে) ৮-১০ কেজি বীজ লাগে। বারি সূর্যমুখী-২ এর জন্য হেক্টর প্রতি ১২-১৫ কেজি বীজের দরকার হয়। সূর্যমুখী বীজ কমপক্ষে ৪-৬ ঘণ্টা বা রাতারাতি পরিষ্কার, ফিল্টার করা জলে ভিজিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সার ব্যবস্থাপনা : গাছের কাঠামো বৃদ্ধি ও পাতা সবুজ রাখার জন্য ইউরিয়া সার ১৮০-২০০ কেজি । শিকড় গঠন ও মজবুত করতে সাহায্য করে  টিএসপি সার ১৫০-২০০ কেজি । রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দানা পুষ্ট করতে এমওপি সার ১২০-১৫০ কেজি। সালফারের জোগান দেয় এবং কোষ গঠনের জন্য জিপসাম ১২০-১৭০ কেজি দেওয়া যেতে পারে। ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ৮০-১০০ কেজি  ব্যবহার করতে হবে। পরাগায়ন বৃদ্ধি ও ফল ফাটা রোধ করতে কার্যকর করতে বরিক এসিড ১০-১২ কেজি প্রয়োগ করুন। গাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও হরমোন নিঃসরণে ভূমিকার জন্য  জিংক সালফেট দিন ৮-১০ কেজি।

সার প্রয়োগ পদ্ধতি : অর্ধেক ইউরিয়া এবং বাকি সব সার শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ২ ভাগ করে প্রথম ভাগ চারা গজানোর ২০-২৫ দিন এবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০-৪৫ দিন পর (ফুল ফোটার পূর্বে) প্রয়োগ করতে হবে।

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

বিছা পোকার ক্ষেত্রে পোকা দেখার সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে পোকাসহ পাতা সংগ্রহ করে পোকা মেরে ফেলতে হবে। সেচ নালায় কেরোসিন মিশ্রিত পানি থাকলে কিড়া পানিতে পড়ে মারা যায়। আক্রমণ বেশি হলে নাইট্রো (সাইপরমেথ্রিন+ ক্লোরোপাইরিপস) ২০ ইসি ২ মিলিলিটার প্রতি লিটার পানিতে আক্রান্ত ক্ষতে ১০ দিন পর পর ২ বার ছিটিয়ে পোকা দমন করা যায়। পাতা ঝলসানো রোগের ক্ষেত্রে রোগসহনশীল জাতের আবাদ করা (যেমন-কিরণী)। প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২ গ্রাম রোভরাল-৫০ ডব্লিউ পি মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩ বার সেপ্র করা বা ফসল কাটার পর পরিত্যক্ত কা-, মূল ও পাতা পুড়িয়ে ফেলা।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা : সূর্যমুখী ফসলের ফলন বেশি পেতে হলে কয়েকবার সেচ দেওয়া প্রয়োজন। প্রথম সেচ বীজ বপনের ৩০ দিন পর (গাছে ফুল আসার আগে), দ্বিতীয় সেচ বীজ বপনের ৫০ দিন পর (পুষ্পস্তবক তৈরির সময়) এবং তৃতীয় সেচ বীজ বপনের ৭০ দিন পর (বীজ পুষ্ট হবার আগে) সেচ দেওয়া দরকার। সূর্যমুখীর জমি সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে। জমিতে আগাছা দেখা দিলে সেটি তুলে ফেলতে হবে।

ফসল তোলা : ৯০-১১০ দিনের মধ্যে ফসল তোলা যায়।

বীজ সংরক্ষণ : সূর্যমুখীর বীজ পরের মৌসুমে লাগানোর জন্য বীজ সংরক্ষণ করতে হয়। বীজ সংরক্ষণের আগে অপরিপক্ক ও ভাঙ্গা বীজ বেছে ফেলতে হবে। মোটা পলিথিন ব্যাগে বা কেরোসিন টিন বা টিনের ড্রামে বীজ সংরক্ষণ করা ভালো। ভেতরে পলিথিন দিয়ে চটের বসত্মায় ভালোভাবে শুকানো বীজ প্রতি ৩০ কেজির জন্য ২৫০ গ্রাম ক্যালসিয়াম ক্লোরাইডসহ সংরক্ষণ করলে ৭-৮ মাস পরেও বীজের শতকরা ৮০ ভাগ অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বজায় থাকে। বর্ষাকালে এক থেকে দুবার বীজ পুনরায় রোদে শুকিয়ে নেওয়া ভালো।