প্রিয়তমের চুলের খোঁপায় গুঁজে দেওয়া কাননের ফুল, একসময় ছিল শুধুই শৌখিন চাষাবাদ। পরবর্তীতে বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু শ্রমজীবী কৃষকের হাত মিলেমিশে ফুল চাষকে এনে দিয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দীপ্ত পরিচয়। গ্রাম-বাংলার বাড়ির আঙিনায় দু-একটি গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা বা শিউলি গাছ লাগিয়ে, প্রিয়জনকে একটি ফুল উপহার দিয়ে যে আত্মতৃপ্তি মিলত, তা-ই ছিল ফুলের বড় প্রাপ্তি। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই ব্যক্তিগত অনুরাগ এখন রূপ নিয়েছে পেশায়, আর পেশা রূপ নিয়েছে শিল্পে। বর্তমানে দেশের নানা প্রান্তে বিস্তীর্ণ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে, আর সেই ফুল রাতের আঁধারে ট্রাকভর্তি হয়ে ছুটে আসে রাজধানীর অলিতে-গলিতে, বাজারে-বাজারে। ভোরের আলো ফোটার আগেই জমজমাট হয়ে ওঠে ফুলের আড়ত; রঙের উচ্ছ্বাস, সুগন্ধের মায়া আর দরদামের কোলাহলে তৈরি হয় এক আলাদা জগত। বিয়ে-শাদি, জন্মদিন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় দিবস কিংবা ভালোবাসা প্রকাশের মতো সব ক্ষেত্রেই ফুলের চাহিদা সারা বছর সমান তালে থাকে, তবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ এলেই যেন চাহিদার ঢেউ উথলে ওঠে আরও একটু বাড়তি উচ্ছ্বাসে।
বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে ফুলের বাজারে নামে উৎসবের জোয়ার। বিশেষ করে যশোরের গদখালী হয়ে ওঠে স্বপ্ন বুননের মাঠ। কৃষকরা আশা করেন, শুধু এই সময়টুকুতেই তারা কোটি কোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন; কৃষি বিভাগের ভাষ্যমতে, শত কোটি টাকার ফুল সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতিও থাকে তাদের। যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দ্ইুধারে তখন রঙিন পসরা সাজিয়ে বসেন চাষিরা। কেউ ভ্যানে, কেউ সাইকেলে, কেউ বা মোটরসাইকেলের পেছনে ঝুড়িভর্তি তাজা ফুল নিয়ে ব্যস্ত দরদামে।
এ ছাড়াও ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে ফুল নিয়ে মানুষের কর্মতৎপরতা চোখে পড়ার মতো। এ বিষয়ে শাহবাগের এক ফুল বিক্রেতা জানান, ‘এই ব্যবসা তাকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করেনি, আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে।’ কৃষি গবেষকদের মতে, ‘ফুল চাষ এখন আর একক কৃষকের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চারা উৎপাদনকারী, সার ও বালাইনাশক সরবরাহকারী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আড়তদার, খুচরা বিক্রেতাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ শৃঙ্খল।’ ফুলের বাগান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা; বাণিজ্যিক আকারে চাষ করতে গিয়ে উন্নত জাতের চারা, আধুনিক সেচব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সার ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ব্যবহার। ফলে প্রযুক্তি ও কৃষি-জ্ঞানও যুক্ত হচ্ছে এই খাতে। একসময় যে ফুলকে কেবল শখের বস্তু ভাবা হতো, আজ তা অর্থকড়ি ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক প্রফেসর এবং কৃষি গবেষক ফয়জুল্লাহ ফায়েজ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ফুল মানুষের শৌখিনতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাস করে। এটি এমন এক ফসল, যে ফসলের চাহিদা কখনোই কমবে না। দিন যত সামনের দিকে এগুবে ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ ততই বাড়বে। তাই বাংলাদেশে ফুল চাষে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রচুর। অনেকেই অলরেডি চাষ করছে, বিশেষ করে ঢাকার খুব কাছে গোলাপ গ্রাম হতে পারে একটি ?সুন্দর দৃষ্টান্ত।’ যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ফুল চাষ আরও বড় আকারে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন ফুল চাষকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তুলনামূলক কম জমিতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে এবং দ্রুত নগদ অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ থাকায় এই খাত তাদের আকৃষ্ট করছে। গ্রামীণ নারীরাও ফুল বাগানের পরিচর্যা, মালা গাঁথা ও প্যাকেজিংয়ের কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারে বাড়তি আয়ের সংস্থান করছেন। ফলে ফুল চাষ হয়ে উঠছে গ্রামীণ উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের চাবিকাঠি। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেখানে দাম ওঠানামা, সংরক্ষণে ঘাটতি, পরিবহন সমস্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবু পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও প্রজ্ঞার এই ফসল; সম্ভাবনার সুবাস ছড়িয়ে জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে সৌন্দর্যও হতে পারে সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল পথ।’

