ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

পানির খোঁজে মাইলের পর মাইল

মির্জা হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০৬:১৮ এএম

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ বলতে আমরা বুঝি দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। কিন্তু সরকারি হিসেবে এই তিন জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে প্রায় ২১ লাখ মানুষের ভাগ্য এখন পানিশূন্য মানচিত্রের রেখায় বন্দি। এক কলস সুপেয় পানির জন্য মাইল পথ হাঁটা কিংবা বাড়ির আঙিনায় অকেজো হয়ে পড়ে থাকা নলকূপের হাতল নাড়ানো এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের নিয়তি। এর কারণ কী? সমাধানই বা কিসে?

ভূগর্ভের শূন্যতা

বরেন্দ্রের মাটির গঠন অন্য দশটি অঞ্চলের মতো নয়। এখানকার মাটির নিচে পানি ধরে রাখার যে প্রাকৃতিক আধার বা ‘অ্যাকুইফার’, তা ক্রমাগত শুকিয়ে যাচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, গত কয়েক দশকে নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার ফলে মাটির নিচের এই পানির ভান্ডার আজ মৃতপ্রায়। আগে ১০০ বা ২০০ ফুট গভীরে যে পানি পাওয়া যেত, এখন তা হাজার ফুট নিচে নেমেও মিলছে না। ফলে শুধু সেচ নয়, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন সুপেয় পানির উৎসগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে। যে মাটিকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের অর্থনীতি আবর্তিত হয়, সেই মাটিই এখন ভেতর থেকে পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে।

লাখ মানুষের তৃষ্ণা

ওয়ারপো (ডঅজচঙ) যখন ১৫৩টি ইউনিয়নকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করে, তখন এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল ২১ লাখ মানুষের জীবনের কঠিন সংকটের স্বীকৃতি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এখন পানি হলো বিলাসিতা। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলে দেখা যায়, বাড়ির নলকূপগুলো স্রেফ লোহার কঙ্কাল হয়ে আছে। ভোর হওয়ার আগেই কলস নিয়ে নারীরা বেরিয়ে পড়েন দূরবর্তী সচল গভীর নলকূপের সন্ধানে। অনেক সময় এক কলস পানি সংগ্রহ করতে তাদের ব্যয় করতে হয় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। এই দীর্ঘ পথচলা কেবল শারীরিক শ্রম নয়, বরং মানবিক মর্যাদার সংকটও বটে। পানির হাহাকার জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে শিশুদের শিক্ষা ও নারীদের স্বাস্থ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

সেচের গ্রাস

একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো চাষের যে বিপ্লব ঘটেছিল, তার প্রধান হাতিয়ার ছিল গভীর নলকূপ। কিন্তু সেই সাফল্যের মূল্য আজ দিতে হচ্ছে মানুষকে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী যেখানে মাত্র ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ৬৬ হাজার শ্যালো ও গভীর নলকূপ। কৃষির জন্য পানি তোলার এই অসম প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের কণ্ঠনালী শুকিয়ে দিচ্ছে। জমিতে সেচ দিতে গিয়ে গভীর নলকূপগুলো অবিরাম পানি তোলে, অন্যদিকে আশপাশের অগভীর নলকূপগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষি বনাম তৃষ্ণা; এমন অসম লড়াইয়ে লিপ্ত বরেন্দ্রর মানুষ। মাঠের ফসল বাঁচবে না কি ঘরের তৃষ্ণা মিটবে, এই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা।

ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্ন

বরেন্দ্র অঞ্চলের গ্রামগুলোতে একসময় প্রায় সবার বাড়ির কাছেই পুকুর ছিল, যেখানে মানুষ দৈনন্দিন কাজ সারত। আজ সেই পুকুরগুলোর বুক চিরে জন্মেছে আগাছা। মাটির নিচের পানিস্তর নেমে যাওয়ায় উন্মুক্ত জলাশয়গুলো রিচার্জ হতে পারছে না। ফলে শুধু পান করার পানি নয়, গৃহস্থালি ও গবাদি পশুর পানির সংকটও চরমে পৌঁছেছে। গোসল করা থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতার সাধারণ কাজগুলোও এখন এ অঞ্চলের মানুষের কাছে সংগ্রামের নামান্তর। মানুষ যেখানে দুবেলা খাওয়ার পানি জোটাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যেন দূরের স্বপ্ন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা বারবার বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য, ফলে প্রকৃতির নীল রং দিন দিন ধূসর হয়ে যাচ্ছে।

গেজেট ও বাস্তবায়ন

সরকার গত জানুয়ারি মাসে প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন নলকূপ স্থাপন ও অপ্রয়োজনীয় পানি তোলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ১০ বছরের জন্য এই এলাকাকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। আইনের কড়াকড়ি থাকলেও নতুন নতুন শ্যালো মেশিন বসানো পুরোপুরি থামেনি। তাই, ২১ লাখ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে হলে কেবল কাগজের গেজেট যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিকল্প পানির উৎস নিশ্চিত করা। পদ্মা বা পুনর্ভবা নদী থেকে পানি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা না গেলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ও পানির অপচয় রোধ হতে পারে এই সংকটের কার্যকর সমাধান। পানি জীবনের অপর নাম। বরেন্দ্রর ২১ লাখ মানুষের কাছে এই জীবন এখন অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্তে যে এলাকাকে সংকটাপন্ন বলা হচ্ছে, সেখানে প্রতিদিনের লড়াইটা অত্যন্ত অমানবিক। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে উত্তরের এই উর্বর জনপদ একদিন তৃষ্ণার্ত মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার পথে আরও এগিয়ে যাবে। সেই বিপন্নতা রুখতে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা, যেখানে কৃষিও বাঁচবে, ২১ লাখ মানুষের তৃষ্ণাও মিটবে।