প্রখর রোদ, তীব্র তাপপ্রবাহ আর অস্বাভাবিক আবহাওয়াÑ গ্রীষ্মকাল এখন শুধু মানুষের জন্যই নয়, গবাদি পশুর জন্যও বড় এক চ্যালেঞ্জ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামারে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। খাদ্যে অনীহা, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা, এমনকি হিট স্ট্রোকেও মারা যাচ্ছে অনেক পশু। ফলে খামারিদের বাড়তি সতর্কতা ও সচেতনতা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমের সময় সামান্য অবহেলাও একটি সুস্থ পশুকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। তাই প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবস্থাপনা।
গরমে কেন কষ্ট পায় গবাদি পশু
গবাদি পশুর শরীরে ঘামগ্রন্থি খুব কম থাকায় তারা মানুষের মতো সহজে শরীর ঠান্ডা করতে পারে না। অতিরিক্ত গরমে পশুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুধেল গাভী ও মোটাতাজাকরণে থাকা পশুগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তীব্র গরমে অনেক পশু খাবার কম খেতে শুরু করে। এতে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয় এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়। খামারিদের ভাষায়, ‘গরমে পশু শুধু বেঁচে থাকলেই হয় না, সুস্থ রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
বিশুদ্ধ পানি হতে পারে প্রাণ বাঁচানোর উপায়
গরমের সময় পশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পানি। একটি গরু দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত পানি পান করতে পারে। তাই সারাক্ষণ পরিষ্কার ও ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পানি রাখার পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে জীবাণু জন্মাতে পারে, যা ডায়রিয়া বা অন্যান্য রোগের কারণ হতে পারে। অনেক খামারি এখন পানিতে ইলেকট্রোলাইট বা স্যালাইন মিশিয়ে পশুর পানিশূন্যতা রোধের চেষ্টা করছেন।
খামারে চাই ঠান্ডা ও আরামদায়ক পরিবেশ
গরমে খামারের পরিবেশই অনেক সময় পশুর স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। খামারে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। টিনের ঘর হলে ছাদে পানি ছিটিয়ে তাপমাত্রা কমানো যেতে পারে।
অনেক আধুনিক খামারে এখন ফ্যান, স্প্রিংকলার কিংবা কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে গ্রামীণ পর্যায়েও সহজ কিছু উপায় কার্যকর হতে পারেÑ যেমন খামারের চারপাশে গাছ লাগানো, বাঁশের চাটাই ব্যবহার কিংবা ছাউনিতে খড় বিছিয়ে রাখা।
খাদ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন বাড়তি নজর
গরমে পশুর হজমক্ষমতা কমে যাওয়ায় খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আনা জরুরি। সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কাঁচা ঘাস, ভুসি, খৈল ও মিনারেলসমৃদ্ধ খাদ্য পশুর শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের অতিরিক্ত গরম সময়ে খাবার না দিয়ে সকাল ও সন্ধ্যায় বেশি খাবার দেওয়া ভালো। এতে পশু স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারে।
পরিচ্ছন্নতা কমাবে রোগের ঝুঁকি
অপরিচ্ছন্ন খামারে মাছি-মশার উপদ্রব বাড়ে এবং দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাই খামার সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। পশুর শরীর নিয়মিত ধুয়ে দিলে শরীর ঠান্ডা থাকে এবং আরাম পায়। গরমে অনেক সময় চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়। তাই পশুর আচরণে পরিবর্তন দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
খামারিদের সচেতনতাই বড় ভরসা
বর্তমানে অনেক খামারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃষি অফিস ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে গবাদি পশুর পরিচর্যা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারাও খামারিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গরমে পশুর যতেœ সচেতনতা বাড়লে উৎপাদন ঠিক থাকবে, রোগ কমবে এবং খামারির আর্থিক ক্ষতিও অনেকাংশে কমে আসবে।
গবাদি পশু শুধু খামারির সম্পদ নয়, দেশের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই গ্রীষ্মের তীব্র গরমে পশুর সঠিক যতœ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সামান্য সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনাই পারে গবাদি পশুকে সুস্থ রাখতে এবং খামারিকে লাভবান করতে।
লেখক : লাইভস্টক অ্যাসিস্ট্যান্ট (এলএ)
অ্যানিমেল জেনেটিক্স বিভাগ
শ্রীপুর, কুমিল্লা

