× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

ডিজিটাল বৈষম্যের কবলে গ্রামীণ জনপদ

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

ডিজিটাল বৈষম্যের কবলে গ্রামীণ জনপদ

ঢাকার ধানমন্ডির একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ান তার হাই-স্পিড ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটের কল্যাণে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদেশের একটি নামি প্রতিষ্ঠানের অনলাইন কর্মশালায় অংশ নিচ্ছে। ফোর-কে রেজোলিউশনের ভিডিও স্ট্রিমিংয়ে কোথাও কোনো ল্যাগ নেই, নেই কোনো বাফারিংয়ের বিরক্তি। ঠিক একই সময়ে, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের কোলঘেঁষা একটি গ্রামে বসে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী রফিক একটি জরাজীর্ণ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের স্মার্টফোনটি বারবার মাথার উপরে তোলার চেষ্টা করছে। তার ফোনের ৪জি সিগন্যাল বারটি বারবার ২জিতে নেমে আসছে। একটি ভিডিও ফাইল ডাউনলোড করতে রফিকের সময় লাগছে প্রায় দশ মিনিট, যেখানে আরিয়ানের সেই কাজ মিনিটে শেষ হয়ে যায়। এই যে আরিয়ান ও রফিকের ইন্টারনেটের গতির ব্যবধান, তা কিন্তু কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের উদীয়মান ডিজিটাল ডিভাইড বা ডিজিটাল বিভাজনের একটি নগ্ন প্রতিচ্ছবি। একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ও স্মার্ট বাংলাদেশের রূপকল্প, অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেটের গতি ও সহজলভ্যতার আকাশ-পাতাল বৈষম্য- এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে পড়ে আছে এক বিশাল জনগোষ্ঠী।

অবকাঠামো

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি। কাগজে-কলমে এই সংখ্যাটি অত্যন্ত প্রভাবশালী মনে হলেও, এর গুণগত বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। শহরের একজন ব্যবহারকারী যেখানে ৫ এমবিপিএস থেকে ১০০ এমবিপিএস পর্যন্ত স্থির গতির ব্রডব্যান্ড সুবিধা ভোগ করছেন, সেখানে গ্রামীণ গ্রাহকদের প্রায় ৯৫ শতাংশই নির্ভরশীল মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর। এদিকে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি তাত্ত্বিকভাবে ৪জি বলা হলেও বাস্তবে তার গড় গতি অনেক ক্ষেত্রেই ৩জি-এর চেয়েও কম। ফাইবার অপটিক ব্যাকবোন শহরগুলোতে যতটা শক্তিশালী, প্রান্তিক পর্যায়ে তার সম্প্রসারণ ততটাই মন্থর। বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী মোবাইল অপারেটরদের একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম গতি নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নেটওয়ার্ক কনজেশন বা গ্রাহক সংখ্যার আধিক্যের কারণে গ্রামে সেই গতি বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এই গতির পার্থক্যের কারণেই তৈরি হচ্ছে ব্যান্ডউইডথ বৈষম্য, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। এখানে শুধু গতির প্রশ্নই নয়, বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যয়ের সক্ষমতাও। শহরের ব্রডব্যান্ড গ্রাহকরা একটি নির্দিষ্ট মাসিক ফি-তে আনলিমিটেড ডেটা ব্যবহার করতে পারছেন। অন্যদিকে, গ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রতি জিবি ডেটা চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বোঝা তাদের ডিজিটাল দুনিয়ার নানা সম্ভাবনা থেকে ছিটকে ফেলে দিচ্ছে।

ই-এডুকেশন

করোনা মহামারি পরবর্তী পৃথিবীতে অনলাইন শিক্ষা বা ই-এডুকেশন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইডের কারণে এই শিক্ষা পদ্ধতিটি গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের এক্সক্লুশন বা বর্জনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যখন জুম বা গুগল মিটে লাইভ ক্লাস করছে, গ্রামের শিক্ষার্থীরা সেখানে নেটওয়ার্কের অভাবে যুক্ত হতে পারছে না। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটার কথা ছিল সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য, অথচ এটি গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা বা বড় ভিডিও লেকচার ডাউনলোড করা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে বিলাসিতার নামান্তর।

ই-হেলথ

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন বা ই-হেলথ এক অনন্য সম্ভাবনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে একজন রোগীকে পর্যবেক্ষণ করতে যে ন্যূনতম ৪-৫ এমবিপিএস আপলোড স্পিড প্রয়োজন, তা অনেক ইউনিয়ন পর্যায়েও পাওয়া সম্ভব হয় না।

ফলস্বরূপ, একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ভিডিও কলে রোগীর শারীরিক লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পান না। এই ধীরগতির সংযোগের কারণে ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ব্যাহত হয়, যা ভুল রোগ নির্ণয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ই-হেলথ সার্ভিসগুলো তাই কার্যকরভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে যেতে পারছে না। ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন বা ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড তৈরির জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন ডেটাবেজ সংযোগ প্রয়োজন, তা প্রান্তিক পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অনুপস্থিত। অবকাঠামোগত এই দৈন্যতা ই-হেলথকে কেবল একটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আটকে রেখেছে।

ব্যবহারের সক্ষমতা

অনেক সময় আশা দেখানো হয়। তবে ডিজিটাল ডিভাইডের আলোচনা কেবল টাওয়ার বসানো বা ফাইবার ক্যাবল টানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এখানে একটি বড় প্রশ্ন হলো ইউসেজ ক্যাপাবিলিটি বা ব্যবহারের সক্ষমতা। গ্রামের অনেক ব্যবহারকারীর হাতে স্মার্টফোন থাকলেও তারা ইন্টারনেটকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিনোদনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন। এর পেছনে যেমন রয়েছে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, তেমনি রয়েছে ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব। বিটিআরসির তথ্যানুসারে গ্রাহক সংখ্যা বাড়লেও, উৎপাদনশীল কাজে ইন্টারনেটের ব্যবহার প্রান্তিক পর্যায়ে অত্যন্ত নগণ্য। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স বা সরকারি ই-সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষ এখনো শহরমুখী। সরকারের কয়েক হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা ইউডিসি থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে সেখানেও ইন্টারনেটের মান সন্তোষজনক নয়। একজন গ্রামের উদ্যোক্তা তার পণ্য অনলাইনে বিক্রি করতে গিয়ে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হলে প্রযুক্তির ওপর তার আস্থা কমে যায়। এটি অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়েও বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা।

বৈষম্য নিরসনের পথ

ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে কিছু মৌলিক পরিবর্তনের বিকল্প নেই। নিচে কিছু ধারণার কথা বলা হলো-

ফাইবার অপটিক সম্প্রসারণ : ইউনিয়ন পর্যায় থেকে গ্রাম পর্যন্ত ফাইবার অপটিক ক্যাবল পৌঁছানোর জন্য লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের গ্রামে ব্রডব্যান্ড প্রসারে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ : গ্রামের মানুষের জন্য মোবাইল ইন্টারনেটের খরচ কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সাইটগুলোতে জিরো রেটিং বা ফ্রি অ্যাক্সেস প্রদান করা যেতে পারে।

ডিজিটাল সাক্ষরতা : কেবলমাত্র ইন্টারনেট দিলেই হবে না, মানুষকে শিখাতে হবে কীভাবে এই ইন্টারনেট ব্যবহার করে আয় করা যায় বা জীবনযাত্রার মান উন্নত করা যায়।

অবকাঠামো উন্নয়ন : প্রান্তিক টাওয়ারগুলোতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৪জি বা ৫জি সরঞ্জাম স্থাপন নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ব্যাকআপ পাওয়ারের ব্যবস্থা করা। ডিজিটাল ডিভাইড কেবল প্রযুক্তিগত দূরত্ব নয়, এটি একটি নতুন ধরনের আর্থ-সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস। এক সময় বৈষম্য ছিল জমিদার আর প্রজার মাঝে, এখন সেই বৈষম্য রূপ নিয়েছে হাই-স্পিড ইন্টারনেট আর লো-স্পিড ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীর মাঝে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে আমরা যদি গতির এই ব্যবধান ঘোচাতে না পারি, তবে রফিকের মতো কোটি তরুণ তাদের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সময়ের থেকে পিছিয়ে পড়বে। 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!