× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মাইনুল হক ভূঁঁইয়া

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ০১:১১ পিএম

বন্ধ-খোলার খেলায় রাজউক

মাইনুল হক ভূঁঁইয়া

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ০১:১১ পিএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

কয়েক মাস ধরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাঙাভাঙি এবং বন্ধ-খোলার খেলা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে বৈদ্যুতিক মিটার জব্দের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। পাশাপাশি কদিন পর সেই মিটার আবার ফিরিয়ে দেওয়ার নজিরও তৈরি হচ্ছে অসংখ্য। এই খেলায় রাজউকের জোনগুলোর বাতাসে রীতিমতো টাকা উড়ছে বলে চাউর আছে। অবশ্য নকশার ব্যত্যয় ঘটানো যেসব স্থাপনার অংশবিশেষ ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেগুলোতে সংস্থার আর কিছুই করার থাকছে না। কিন্তু বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল এবং মিটার ফেরতে চলছে শুভংকরের ফাঁকি। এই সুযোগে জোনে জোনে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। ওই সব ভবনমালিকের কাছ থেকে অনৈতিক অর্থ আদায়ে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। জোনের অথরাইজড অফিসার কিংবা প্রধান ইমারত পরিদর্শকের মাধ্যমে রফা হচ্ছে এবং চাহিদামতো অর্থ পেলেই তার বৈদ্যুতিক মিটার ফিরিয়ে দিয়ে সংযোগ সচলের আদেশ জারি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর কোনোটি প্রকাশ্যে আসছে, কোনোটি একেবারেই আড়াল হচ্ছে। তবে রাজউকের উত্তরা জোনাল কার্যালয়ের বিধি বাম, তাদের একটি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটেছে আজমপুর কাঁচাবাজারসংলগ্ন দক্ষিণখান এলাকায়।

অভিযোগ রয়েছে, দক্ষিণখানের জামতলা মসজিদের কাছে ৩০৬ নম্বর ভবনটি নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত হচ্ছিল। রাজউকের উত্তরা জোনাল কার্যালয়ের নেতৃত্বে ভবনটিতে অভিযান পরিচালনা করে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি মিটার জব্দ করা হয়। সেই সঙ্গে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় লক্ষ্য করা যায়, সেই ভবনের নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে।

কৌতূহলী এলাকাবাসী খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, ১৫ লাখ টাকায় রফা হয়েছে। ভবন মালিক মামুন মিয়া ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। বাকি ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পর বিদ্যুতের মিটার ফেরতের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ভবন মালিক তাই জেনারেটর চালিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার সত্যতা মিলেছে। কিন্তু রাজউক উত্তরা কার্যালয়ের অধীন ২/২ জোনের দায়িত্বশীলরা বিষয়টি স্বীকার করেননি। জানতে চাইলে জোনের অথরাইজড অফিসার হাসানুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি জেনে জানাব।’ এ সময় তিনি প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শকদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে প্রধান ইমারত পরিদর্শক নাজমুল আহসানের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ধরনের ঘটনা আরও আছে। আফতাবনগরের ‘এফ’ ব্লকে আছে এমন বহু নজির। এই এলাকায় বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে জব্দ করা বিদ্যুতের মিটার রাজউক আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। গোড়ানে এ ধরনের চারটি ঘটনা ঘটেছে। এখানে অভিযান চালিয়ে রাজউক জোন-৬-এর ৬/১ উপ-জোন চারটি ভবনের বিদ্যুতের মিটার জব্দ করে। অবশ্য কদিন পরই আবার সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এসব ভবনের হোল্ডিং নম্বর হলো ৫ নম্বর সড়কের ১৮৫/১-২, ৩৬ নম্বর সড়কের ৩৭৭/এ, হাওয়াই গলির ৩৪০ এবং একই গলির ৩৩৩/ডি/এ/৫ নম্বর বাড়ি। ভবনগুলো দক্ষিণ গোড়ান এলাকায় অবস্থিত। এ ছাড়া এই এলাকার তিনটি ভবন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় রাস্তা না ছেড়ে নির্মিত হচ্ছে। আরেকটি নির্মীয়মাণ ভবনের কোনা নকশাই নেই। অথচ জোনের ইমারত পরিদর্শকদের সেদিকে নজর নেই। চাউর আছে, প্রতিটি ঘটনা নানা অঙ্কের টাকায় রফা হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে জোনের অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক মো. ইয়াসিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মিটার ফেরত দেওয়ার বিষয়টি আমি জানি না। আমার কাছে কোনো রিপোর্টও চাওয়া হয়নি।’ নকশার ব্যত্যয় ঘটানো এবং নকশাবিহীন চার ভবন প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘আমরা তো রিপোর্ট দিচ্ছি। তার পরও কীভাবে কী হচ্ছে, বলতে পারব না।’

রাজউকের গোপন এরকম রফার ঘটনা সিলগালা করা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন ও হোটেল-রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। গত ২২ জানুয়ারি রাজউক জোন-৪/১-এর আওতাধীন বারিধারা আবাসিক এলাকায় রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সবুজ হাসানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আবাসিক প্লটে অবৈধভাবে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সেলুন, স্পা ও নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে মোট সাত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সবুজ হাসান তখন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আবাসিক এলাকার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা এবং নকশা আইন বাস্তবায়নে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আজকে আমরা বারিধারা এলাকায় অভিযানকালে আবাসিক প্লটে অবৈধভাবে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সেলুন, স্পা ও নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে মোট সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এর মধ্যে চারটি রেস্টুরেন্ট ও সেলুন-স্পা সিলগালা করা হয় এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিই। পরবর্তীকালে বারিধারার বেশির ভাগ সিলগালাই অবমুক্ত হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ক্ষেত্রে নেপথ্যে অনৈতিক লেনদেন এবং টেলিফোনিক তদবিরের অভিযোগও রয়েছে।’

বনানী এলাকার সিলগালা করা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরক্ষণেই খোলার নেপথ্যের কারণ খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। গত বছরের ২৫ নভেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে রাজধানীর বনানীতে অভিযান চালিয়ে রাজউক ১২টি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সেলুন ও স্পা সেন্টার সিলগালা করে দেয়। এ ছাড়া একটি নির্মাণাধীন ভবনের বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

সিলগালা করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল হোটেল আমারি, সিরাজ চুইগোস্ত, টেইলর, টার্কিস কাবাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, ভাই ভাই রেস্তোরাঁ, শাকিল মোটরস, বিবিধারা রেস্টুরেন্টসহ চারটি দোকান, মেন্স ক্লাব, লন্ডন সেলুন ও জেন্টস সেলুন, আহেলী কাবাব অ্যান্ড চায়নিজ রেস্তোরাঁ, পেশোয়ারি (টেইলর শপ), পেশোয়ারি চায়ের দোকান, সালামস কিচেন, খিচুড়িওয়ালা এবং কফিক্স।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এগুলোর সিলগালা রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। আগের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরে গেছে তারা। অথচ তাদের বিরুদ্ধে অবাণিজ্যিক এলাকায় অবৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ ছিল। এখন তারা অবাণিজ্যিক এলাকায় পুরোদমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও রাজউক নির্বিকার। এ ছাড়া এই অভিযানকালে বনানীর বেশ কিছ ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করা হলেও সেগুলো পরদিনই বেচা-বিক্রি শুরু করে। রাজউকের এই বন্ধ-খোলার ঘটনা আমজনতার মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব খেলায় রেফারির ভূমিকায় রয়েছে রাজউকের জোনগুলোর একশ্রেণির অসাধু কর্মচারী। মূলত তাদের সীমাহীন অর্থলিপ্সার কারণে বদনামের ভাগিদার হচ্ছে রাজউক। তবু সংস্থাটির থামাথামি নেই। তারা এখনো প্রায় প্রতিদিনই একই খেলায় মত্ত। এই প্রতিবেদন তৈরির শেষ মুহূর্তে গতকাল শনিবারও (৩১ জানুয়ারি) রাজউকের ৪/২ উপ-জোন বাড্ডা, আফতাবনগর ও আনন্দনগরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তাদের এসব অভিযান প্রসঙ্গে জানার জন্য অথরাইজড অফিসার হাসানুর রেজার ফোনে শনিবার সকাল থেকে অনবরত কল দেওয়া হলেও বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইমারত পরিদর্শক মো. সোহাগ মিয়ার ফোনও ছিল বন্ধ। মূলত রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলা সব সময় দুরূহই। কখনো মোবাইল ফোন খোলা থাকলেও কিছুতেই তারা রিসিভ করতে চান না। এমনকি খুদে বার্তা দিলেও সাড়া মেলে না। জোন ও উপ-জোনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য না পেয়ে শেষমেশ যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাজুল হকের সঙ্গে। কিন্তু রাজউকের জনসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এরাজুল হক নতুন এসেছেন, তাই তার ফোন নম্বর পাওয়া অসম্ভব।

Link copied!