× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

অনলাইন ঋণের ভয়ংকর ফাঁদ

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন

প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৬:১১ এএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

অনলাইনে কয়েক ধাপ পেরোলেই ঋণের টাকা ঢুকছে অ্যাকাউন্টে। মনে হতে পারে, টাকা তো ঢুকছে, তাহলে প্রতারণা কোথায়? বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ-সরল নয়। কারণ ওই কয়েকটি ধাপ পেরোতে গিয়ে নিজেদের অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য-ছবি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের হাতে তুলে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এরপরই শুরু হয় প্রতারকদের আসল খেলা। যা ঋণ নেওয়া হয় তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা দাবি করে আসতে থাকে ফোন। না পেলে ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে করা হয় ব্ল্যাকমেইল। এমন হয়রানির শিকার হয়েছেন বহু মানুষ। তাদের অনেকে দিশা না পেয়ে দ্বারস্থ হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

জানা গেছে, চীনের তৈরি মোবাইল অ্যাপ এবং বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের যৌথ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন সহজ-সরল মানুষ। এ বিষয়ে অবশ্য সতর্ক করছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা। কিন্তু অপরাধী চক্রের কর্মকা- থেমে নেই। তারা নিত্যনতুন কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানান, মোবাইল অ্যাপে ঋণের ফাঁদ আধুনিক সাইবার অপরাধ। বিভিন্ন ভুয়া অ্যাপ সহজ শর্তে ও তাৎক্ষণিক ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তাৎক্ষণিক ক্যাশ’ বা ‘নিরাপদ ঋণ’ শিরোনামে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবহারকারীদের প্রলুব্ধ করা হয়। এরপর অ্যাপ ইন্সটল করার সময় ব্যবহারকারীর কন্ট্যাক্ট লিস্ট, গ্যালারি ও অবস্থানের অ্যাক্সেস নিয়ে নেয় চক্রটি। ঋণের আবেদন করলে প্রসেসিং ফি বা সার্ভিসের নামে একটি বড় অংশ কেটে রেখে সামান্য টাকা দেওয়া হয়। এর মাত্র সাতদিনের মাথায় আকাশচুম্বী সুদ দাবি করা হয়। সময়মতো টাকা দিতে না পারলে ফোনের গ্যালারি থেকে ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে কন্ট্যাক্ট লিস্টে থাকা আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দেখে মনু মিয়া নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী একটি অনলাইন সংস্থা থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সিকিউরিটি ফি বাদ দিয়ে তিনি হাতে পান ৬ হাজার ৮০০ টাকা। আট দিন পর সংস্থাটি থেকে তাকে বলা হয়, সুদসহ ১৫ হাজার টাকা ফেরত দিতে হবে। ১২ দিন পরে ফের ফোন পান মনু মিয়া। তার কাছে চাওয়া হয় ৪৫ হাজার টাকা। অল্প দিনে এত সুদ কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে আসে হুমকি। জানানো হয়, টাকা না দিলে তার ফোনে থাকা পরিবারের সদস্যদের ছবি, ফোন নম্বর ‘বাঁকা পথে’ ব্যবহার করা হবে। কয়েক ঘণ্টা পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে আসে পরিবারের এক মহিলার বিকৃত ছবি। কিছুক্ষণের মধ্যে মনু মিয়ার পরিচিত কিছু মানুষ জানান, তাদের কাছেও ওই বিকৃত ছবি ও কুমন্তব্য পৌঁছে গেছে। সংস্থার পক্ষ থেকে ফের বলা হয়, টাকা না দিলে তার পরিচিত সবার কাছে সব ছবি পাঠিয়ে সামাজিক সম্মান নষ্ট করা হবে। মনু মিয়া ৪৫ দিনের মধ্যে তিন লাখ টাকা দেওয়ার পরও সংস্থাটির হুমকি বন্ধ না হওয়ায় পুলিশের কাছে অভিযোগ দেন। এরপর বন্ধ হয় ফোন আসা।

জানা গেছে, প্রতারণার হাতিয়ার এসব অ্যাপে নিবন্ধনের সময় গ্রাহকের মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিতে হয়। এরপর ১ হাজার ৫০০ টাকা ঋণের আবেদন করলে পাওয়া যায় ৯৭৫ টাকা। বাকি অর্থ বিভিন্ন ফি হিসেবে কেটে নেওয়া হয়। অথচ মাত্র সাত দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হয় ১ হাজার ৭২৫ টাকা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার (দক্ষিণ) সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে চীনসহ আন্তর্জাতিক ও দেশি চক্র জড়িত। গত মাসে এ ধরনের অন্তত ৩০টি অভিযোগ এসেছে। সন্দেহজনক বা ফ্রি গেম/অ্যাপ ডাউনলোড না করা, বিশেষ করে আর্থিক লেনদেনের অ্যাপ থাকা ফোনে অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করার পরামর্শ দেন তিনি।

সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞরা জানান, অনলাইনে ঋণ আবেদন করার সময় নির্দিষ্ট সংস্থার অ্যাপ ‘ইনস্টল’ করতে হয়। সে সময় বেশকিছু বিষয়ে ‘অ্যাকসেস’ চাওয়া হয়। এর মধ্যে মোবাইলে সেভ করা নম্বর, গ্যালারি ইত্যাদি থাকে। গ্রাহকের কাছে দুটি মাত্র ‘অপশন’ দেওয়া হয়Ñ এড়িয়ে যান অথবা অনুমতি দিন। এড়িয়ে গেলে অ্যাপটিতে আর ঢোকা যায় না। বাধ্য হয়ে গ্রাহকেরা ‘অনুমতি দিন’ অপশনটি বেছে নেন। এরপরই ফোনের সার্ভারের কর্তৃত্ব সংস্থার হাতে চলে যায়।

তারা পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রতারকরা নিত্যনতুন পদ্ধতিতে ফাঁদ পাতছে। সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক হতে হবে। বেশি সময়, একাধিক নথির ঝক্কি থাকলেও ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়াই সুরক্ষিত। তাছাড়া যেকোনো অ্যাপ ইনস্টল করার সময় কী কী তথ্য দেখার অনুমতি দিচ্ছেন গ্রাহক, তা অবশ্যই দেখে নিতে হবে। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য-ছবি শেয়ার না করাই ভালো।

ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঋণদান সংস্থা নয়, প্রতারণার এ ধরনের ৫০টির বেশি অ্যাপ আছে। এগুলো চীন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সে দেশ থেকে পরিচালিত সংস্থার পক্ষে নিয়োগ করা হয় স্থানীয় এজেন্ট। কিছু দেশীয় সংস্থার অ্যাপও ইদানীং একই পদ্ধতিতে প্রতারণা শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এ ধরনের প্রতারণা রুখতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সচেতনতা, সতর্কতা ও যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অ্যাপ ব্যবহার না করা। ডিএমপির সাইবার ইউনিট বলছে, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ ধরনের সাইবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। গত এক মাসে এ রকম অন্তত ৩০টি অভিযোগ এসেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, অনলাইনভিত্তিক এই প্রতারণা চক্রগুলোকে শনাক্ত করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের পৃথক সাইবার ইউনিটগুলো কাজ করছে এবং আগের তুলনায় সাইবার নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের নামে প্রতারণার ঘটনা বেড়েছে। খুব শিগগির এমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে অচেনা অ্যাপে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি কোনো ধরনের হুমকি পেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক (মুখপাত্র) বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের নামে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো কর্মকা- নিয়ে র‌্যাবের সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করছে। এরই মধ্যে এ ধরনের চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ঋণ সংস্থার পরিচালিত গোপন অফিসও সিলগালা করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সাইবার নজরদারি চলমান থাকবে।‎

এসব প্রতারক চক্র অনেক সময় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নাম-লোগো ব্যবহার করে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে, ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই সতর্কতা জারি করেছে এবং জানিয়েছে, এসব কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সংস্থাটির মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না এবং এটি আইনত দ-নীয় অপরাধ।

পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪-এর ১৫(২) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া জনসাধারণ থেকে বিনিয়োগ নেওয়া বা ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যেকোনো ধরনের অনলাইন বা অফলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা একটি অপরাধ। এ জন্য কোনো ব্যক্তি ৫ বছর কারাদ- বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিহারের জন্য সবাইকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!