× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

চিম্বুক রেঞ্জের নির্জন শিখরে

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম

চিম্বুক রেঞ্জের নির্জন শিখরে

বান্দরবানের গহিন অরণ্যে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে এমন কিছু জনপদ, যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে শত বছর ধরে। আলীকদমের দুর্গম চিম্বুক রেঞ্জের এমনই এক নির্জন ও রহস্যময় শৃঙ্গের নাম কির্সতং। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৯০০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়টি প্রকৃতিপ্রেমী অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষদের কাছে খুব ভালোলাগার জায়গা। নাগরিক কোলাহল থেকে বহু দূরে, যেখানে মুঠোফোনের সিগন্যাল পৌঁছায় না, সেখানে আদিম অরণ্যের নিস্তব্ধতা ও মেঘেদের লুকোচুরি খেলা দেখতে প্রতিবছর এখানে পাড়ি জমান দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা। ‘কির্সতং’ নামটির উৎপত্তি মারমা ভাষা থেকে। মারমা শব্দ ‘কির্স’ অর্থ একটি বিরল প্রজাতির পাখি এবং ‘তং’ মানে পাহাড়। প্রচলিত আছে, এক সময় এই পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়ায় সেই বিশেষ প্রজাতির পাখির বিচরণ ছিল। এ ছাড়া পাহাড়টি ধনেশ পাখির অভয়ারণ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল। কালের বিবর্তনে সেই পাখিদের দেখা পাওয়া এখন দুষ্কর হলেও, কির্সতংয়ের অরণ্য এখনো তার আদিম রূপ বজায় রেখেছে। বিশাল বিশাল  শতবর্ষী গাছ ও ঘন লতাপাতার আস্তরণ এই পাহাড়কে অন্য সব চূড়া থেকে আলাদা করেছে। এখানে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে প্রকৃতির যে রুদ্ররূপ একইসঙ্গে স্নিগ্ধতা চোখে পড়ে, তা এক কথায় অতুলনীয়।

রোমাঞ্চের শুরু

কির্সতং অভিযানের মূল প্রস্তুতি শুরু হয় বান্দরবানের আলীকদম থেকে। ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সড়কপথে আলীকদম পৌঁছানোর পর যান্ত্রিক বাহনের যাত্রা শেষ হয় মূলত ‘২১ কিলো’ নামক স্থানে। আলীকদম থেকে পানবাজার হয়ে মোটরসাইকেলে করে এই ২১ কিলো পর্যন্ত পথটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া সর্পিল রাস্তায় বাতাসের ঝাপটা, চারপাশের খাড়া পাহাড়ের দৃশ্য আপনাকে বুঝিয়ে দেবে যে, আপনি সাধারণ কোনো ভ্রমণে নন, বরং একটি সত্যিকারের অভিযানে শামিল হতে যাচ্ছেন। যাতায়াতের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালকদের সঙ্গে গন্তব্য বুঝে দামদর করে নেওয়াটাই শ্রেয়, কারণ মৌসুম ভেদে যাতায়াত খরচের তারতম্য ঘটে।

আদিম অরণ্যের প্রবেশদ্বার

২১ কিলো থেকে কির্সতংয়ের চূড়ার দিকে যাওয়ার পথে আপনাকে তিন্দুর রাস্তা ধরে অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা হেঁটে পাড়ি দিতে হবে। এই দীর্ঘ ট্রেকিং শেষে দেখা পাবেন পাহাড়ের কোলে শান্ত জনপদ ‘খেমচং পাড়া’। এটি মূলত ম্রো উপজাতিদের গ্রাম। পাহাড়ের চূড়ায় মাচাং ঘরে তাদের সাদাসিধা জীবনযাপন পর্যটকদের মনে অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। খেমচং পাড়াকে কির্সতং অভিযানের বেসক্যাম্প বলা যেতে পারে। সারাদিনে হাঁটার ক্লান্তি শেষে পাহাড়ের এই নিভৃত পল্লিতে রাত কাটানো অনন্য অভিজ্ঞতা হবে আপনার জন্য। এখানকার আকাশ সমতলের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার, রাতের স্তব্ধতায় পাহাড়ের ডাক শোনা যায় স্পষ্ট।

রহস্যময় জঙ্গল

কির্সতং অভিযানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং কিছুটা ভীতি জাগানিয়া অংশটি শুরু হয় খেমচং পাড়া থেকে চূড়ার দিকে যাওয়ার পথে। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার এই পথে আপনাকে পার হতে হবে রহস্যময় ঘন অরণ্য। বছরের অধিকাংশ সময় এই জঙ্গল কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে। প্রাচীন বিশালকার গাছগুলোর লতাপাতা এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে এখানে দিনের আলোতেও অন্ধকার অনুভূত হয়। অনেকের কাছে এই পথটি ভৌতিক ও মায়াবি অনুভূতির উদ্রেক করে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার সময় শারীরিক সক্ষমতাÑ ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়। তবে চূড়ান্ত চূড়ায় পৌঁছানোর পর যখন মেঘেরা পায়ের নিচে এসে লুটোপুটি খায়, তখন সব ক্লান্তি নিমিষেই সার্থকতা খুঁজে পায়।

পাহাড়ি আতিথেয়তা

দুর্গম এই পাহাড়ের চূড়ায় বিলাসবহুল হোটেলের কোনো অস্তিত্ব নেই। এখানে থাকতে হয় ম্রো আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও কাঠের তৈরি মাচাং ঘরে। মাটির কাছাকাছি মানুষের এই আতিথেয়তা যেকোনো যান্ত্রিক হোটেলের সেবার চেয়েও বেশি আন্তরিক। খাবারের ক্ষেত্রেও নেই বৈচিত্র্যের হাহাকার, পাহাড়ি জুমের চালের ভাত, দেশি মুরগি, আলুভর্তা এবং ঘন ডালই এখানে অমৃতের মতো লাগে। খাবারের জন্য সাধারণত গাইড আগে থেকেই পাড়ার ঘরে কথা বলে রাখেন। ও, বলা হয়নি, পাহাড়ের দুর্গম পথে চলার জন্য গাইড নেওয়া কেবল নিয়মই নয়, বরং নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। গাইডের পারিশ্রমিক এবং খাবারের খরচ আগে থেকেই আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়া ভালো।

প্রয়োজনীয় সতর্কতা

কির্সতং কোনো সাধারণ ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি একটি মাঝারি থেকে কঠিন মাত্রার ট্রেকিং। তাই এখানে যাওয়ার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

শারীরিক সুস্থতা : দীর্ঘ সময় পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য পেশিবহুল শক্তি ও ফুসফুসের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

সরঞ্জাম : ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা, একটি মজবুত লাঠি এবং জোঁক থেকে বাঁচার জন্য পর্যাপ্ত লবণ সঙ্গে রাখা আবশ্যক।

প্রশাসনিক অনুমতি : রুমা বা আলীকদম যে পথেই যান না কেন, আর্মি ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিয়ে অনুমতি নিতে হবে।

বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ : পাহাড়ে গ্রিড বিদ্যুৎ নেই, তাই পর্যাপ্ত ব্যাকআপসহ পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পরিবেশ রক্ষা : পাহাড়ের পরিবেশ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কোনো প্রকার প্লাস্টিক, পলিথিন বা অপচনশীল বর্জ্য ফেলে অরণ্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!