দ্রব্যমূল্যের চাপে হাঁসফাঁস করা সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা এবং প্রযুক্তিপণ্যে শুল্ক ছাড়ের মতো একাধিক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে এবারের বাজেটে।
তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কাগজে-কলমে সুবিধার তালিকা যতই দীর্ঘ হোক না কেন, এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাজেটে কর-শুল্ক কমানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার হাতে পৌঁছায়নি।
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবে কী আছে?
সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা মূল্যস্ফীতিতে। কারণ বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বাস্তবতায় সরকার আগামী অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ জন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে সেটিই হবে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি। কারণ আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধিই বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাজেটে কয়েকটি নিত্যব্যবহার্য পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ বিভিন্ন মসলার ওপরও রেগুলেটরি শুল্ক তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমলে বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শুল্ক কমানো যথেষ্ট নয়। কার্যকর বাজার তদারকি না থাকলে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় পুরো সুবিধা নিজেদের কাছে রেখে দেন। খাদ্য নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষি খাতে একাধিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার, জিংক সালফেট সারের কাঁচামালে শুল্ক শূন্য করা, কীটনাশকের কাঁচামালে ভ্যাট মওকুফ এবং পোলট্রি ও মৎস্যখাদ্যের কাঁচামালে কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন ব্যয় কমলে কৃষক লাভবান হবেন। দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। এবারের বাজেটে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর একটি এসেছে স্বাস্থ্য খাতে। কিডনি রোগীদের জন্য ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে। হার্টের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত স্টেন্ট বা হার্টের রিংয়ের ওপর ভ্যাট তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে একটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে। চোখের অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এছাড়া ক্যানসারবিরোধী ওষুধ এবং ওষুধশিল্পের বহু কাঁচামালে শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিয়ে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, মনিটর, সার্ভার ও প্রিন্টারের ওপর প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসএসডি বা আধুনিক স্টোরেজ ডিভাইসের ওপরও বড় ধরনের কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, তথ্য-প্রযুক্তি খাতের কর্মী এবং উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম দামে প্রযুক্তিপণ্য কিনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজেটে শিশু, নারী, বিধবা, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। সরকার জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে আরও বেশি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে নি¤œ আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাগত শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু কর্মসংস্থানের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিপণ্য, কৃষি উৎপাদন এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে দেওয়া সুবিধাগুলো কার্যকর হলে মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু ঘোষণায় আস্থা রাখতে চায় না। তারা বাজারে চাল-ডাল-তেলের দাম কমতে দেখতে চায়, চিকিৎসার খরচ কমতে দেখতে চায়, চাকরির সুযোগ বাড়তে দেখতে চায়। সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য আশা ও প্রত্যাশার একটি প্যাকেজ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে একটাই বিষয়ের ওপর, তা হলো বাস্তবায়ন। কাগজের বাজেট কতটা মানুষের জীবনের বাজেটে পরিণত হয়, সেটিই হবে আগামী বছরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) প্রাক্তন গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেছেন, এই বাজেটের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করেন তিনি।

