এক সঙ্গে মাদ্রাসায় যেত, এক সঙ্গে খেলাধুলা করত, চারজনের বাড়িও ছিল পাশাপাশি। খেলাধুলা আর বেড়ে ওঠার সঙ্গী ছিল তারা। সেই চার শিশুর জীবনও শেষ হলো একই দিনে, একই খালের পানিতে। হৃদয়বিদারক এ ঘটনার পর নরসিংদীর রায়পুরায় এক সঙ্গেই তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে স্থানীয় সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে চার মাদ্রাসাছাত্রীকে। এ দৃশ্যে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। এরই মধ্যে শোক না কাটতেই একই উপজেলায় মেঘনা নদীতে গোসল করতে নেমে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ময়নাতদন্ত ছাড়াই চার শিশুর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার শিশুর পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রায়পুরা উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের বড়কান্দা গ্রামের ঈদগাহ মাঠে চার শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে তাদের দাফন করা হয়।
নিহত চার শিশু হলোÑ রায়পুরা উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের বড়কান্দা গ্রামের শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩), রুবেল মিয়ার মেয়ে আয়েশা (৯), মো. রুবেলের মেয়ে জান্নাত (৮) এবং বিল্লাল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া (১০)। তারা সবাই স্থানীয় গাউসিয়া নুরে মদিনা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল। এর আগে ওই দুপুরে উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের বড়কান্দা গ্রামের একটি খালে গোসল করতে নেমে তাদের মৃত্যু হয়।
চান্দেরকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন খন্দকার মিতুল বলেন, এক সঙ্গে বেড়ে ওঠা চার শিশুর এক সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের সিদ্ধান্তে তাদের এক সঙ্গে জানাজা ও পাশাপাশি দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার শিশুর পরিবারই অত্যন্ত দরিদ্র। তাবিয়ার বাবা শামীম মিয়া একজন দিনমজুর। আয়েশার বাবা রুবেল মিয়া বিভিন্ন বাজারে কলা বিক্রি করেন। জান্নাতের বাবা মো. রুবেল এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। আর সুমাইয়ার বাবা বিল্লাল মিয়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শুকনো মৌসুমে খালটিতে পানি না থাকলেও বর্ষায় সেটি পানিতে ভরে যায়। নিহত চার শিশুর কেউই সাঁতার জানত না। কাউকে না জানিয়েই তারা গোসল করতে নেমেছিল।
নিহত তাবিয়ার বাবা শামীম মিয়া বলেন, ‘স্টেশনে ঢাকার ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলাম। ট্রেনে ওঠার সময় বাড়ি থেকে কল দিয়া কইলো, মেয়ে পানিত পড়ছে। দৌড়ায়ে হাসপাতালে গিয়া দেহি মেয়ের লাশ পড়ে আছে। আমার একটা মাত্র মেয়ে, আর নাই। কেমনে কী হইল, কিছুই জানি না। মেয়ের তো মাদ্রাসায় থাকার কথা আছিল, সে খালে গেল কেমনে?’
নিহত আয়েশার বাবা রুবেল মিয়া টিনের ঘরের এক কোণে বসে কান্না করছিলেন। তিনি বলেন, অভাবের সংসারে মেয়ের দুষ্টুমি আর হাসিখুশি মুখ দেখে কষ্ট ভুলে থাকতাম। ওই মেয়েটিই আর নাই। এখন কাকে আদর করব।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, নিহত চার শিশুর পরিবারের সদস্যরা লাশের ময়নাতদন্ত চাননি। তাদের কোনো অভিযোগ না থাকায় লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে চার শিশুর লাশ বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিকেলে স্বজনেরা লাশগুলো এলাকায় নিয়ে যান।
নদীতে গোসলে নেমে আরও দুই শিশুর মৃত্যু : রায়পুরায় চার শিশুর মৃত্যুর শোক না কাটতেই আবারও পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার চরাঞ্চল শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়েদাবাদ গ্রামের ভেলুয়ারচরে মেঘনা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। মৃত দুই শিশু হলো ভেলুয়ারচর এলাকার নুরুজ্জামানের মেয়ে জান্নাতি আক্তার (৮) ও সাদ্দাম মিয়ার মেয়ে নিপা আক্তার (৭)।
পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জান্নাতি ও নিপা মেঘনা নদীতে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে তারা পানিতে তলিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন নদী থেকে তাদের উদ্ধার করে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাদের মৃত ঘোষণা করেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক।
হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শীলা আক্তার বলেন, বেলা পৌনে ১টার দিকে দুই শিশুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাদের কারোরই হৃৎস্পন্দন পাওয়া যায়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গেছে জানিয়ে ওসি মজিবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন