বিগত এক দশকের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলেছে। ভোটার উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়া, কেন্দ্র ফাঁকা থাকা, নির্বাচন নিয়ে হাস্যরস এসব কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতার নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থাহীনতারও প্রতিচ্ছবি। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এক নতুন প্রত্যাশার পথে হাঁটছে। সেই প্রত্যাশার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হচ্ছেÑ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এ নির্বাচনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে গভীর শঙ্কা এখনো কাটেনি। পতিত আওয়ামী লীগের ডাকে সাড়া দিয়ে একটি অংশ ভোট বর্জন করতে পারে এই আশঙ্কার পাশাপাশি ‘মব সংস্কৃতি’, গুপ্ত হামলা ও রাজনৈতিক সহিংসতা সব মিলিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক প্রকট। হিন্দু মানেই আওয়ামী লীগ এই সামাজিক স্টেরিওটাইপের কারণে ভোটকেন্দ্রে গেলেই হামলার শিকার হতে পারেন এমন ভয় কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ছাড়াও নির্বাচনি প্রচারণায় প্রার্থীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। যখন প্রার্থীরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন সাধারণ ভোটারদের নিরাপদ অংশগ্রহণ আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। ক্যালেন্ডারের হিসাবে আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই। বরং গ্রামাঞ্চলে আতঙ্ক, অনাস্থা ও নিরুৎসাহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
যদিও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য আশ্বাসপূর্ণ। কিন্তু তার প্রতিফলন মাঠে নেই। আর এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। রাজধানীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা দিয়ে দেশব্যাপী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। মগবাজারের ভোটকেন্দ্র আর তেঁতুলিয়া বা চরাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রের বাস্তবতা এক নয়। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে আগাম, দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ‘মব’, ভয়ভীতি ও সহিংসতা চলতেই থাকবে।
এই নির্বাচন কেবল আরেকটি সাংবিধানিক আয়োজন নয়। এটি গণঅভ্যুত্থানের পরিণতি, জনগণের আত্মত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের জবাব। তাই এটিকে কোনোভাবেই প্রহসনে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন শেষ সুযোগ নিজেদের স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব ও সাংবিধানিক শক্তি প্রমাণ করার।
নির্বাচন কমিশনকে এখনই কয়েকটি বিষয়ে কঠোর হতে হবে। এরমধ্যে, প্রার্থী ও ভোটার উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগেভাগেই মাঠে নামাতে হবে এবং তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা দৃশ্যমান করতে হবে। এ ছাড়া ‘মব’ সহিংসতা ও ভয় দেখানোর ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। যারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইবে তারা যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও আস্থাবর্ধক উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তারা ভয়মুক্ত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হলে নাসির উদ্দিন কমিশনও অতীতের কমিশনগুলোর মতোই ইতিহাসে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। কিন্তু শক্ত হাতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে এই কমিশনই নতুন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের সূচনাকারী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের তারা ইতিহাসের কোন পাশে দাঁড়াতে চান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন