× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রাইসুল সৌরভ, আইনবিষয়ক ডক্টরাল গবেষক, গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ০২:২২ এএম

ডিএনসিসির নতুন নির্দেশিকা : ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা?

রাইসুল সৌরভ, আইনবিষয়ক ডক্টরাল গবেষক, গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ০২:২২ এএম

ডিএনসিসির নতুন নির্দেশিকা : ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা?

কিছুদিন আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ যখন নগরে বাড়িভাড়া বিষয়ক বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল তখন রাজধানীর অগণিত ভাড়াটিয়ার মনে স্বস্তির আশা জাগালেও গত ২০ জানুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বিস্তারিত নির্দেশিকা তুলে ধরার পর এ বিষয়ে নতুন কিছু আইনি প্রশ্ন ও বিড়ম্বনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে ডিএনসিসি নির্দেশিকা জারির দুই দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিয়েছে যে বাড়িভাড়া নির্ধারণ মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দরকষাকষি এবং বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এর আগে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বিগত ২ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের বাড়িভাড়া নির্ধারণে নীতিমালা প্রস্তুতে রুল জারি করেছিল। 

ডিএনসিসি ঘোষিত নির্দেশিকার কয়েকটি বিধান ভাড়াটিয়াদের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ডিএনসিসির বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল একটি নিয়ন্ত্রণহীন ও ভাড়াটিয়া নিষ্পেষিত বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা। এখন সেটিই বরং আইনগত বৈধতা ও বাস্তবে প্রয়োগযোগ্যতার প্রশ্নে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।

নির্দেশিকার ৪ দফানুসারে বাড়িওয়ালা তার প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদের ও মূল গেটের (সদর দরজা) চাবি শর্তসাপেক্ষে দেবেন। কিন্তু শর্ত কী রকম হতে পারে বা শর্ত নির্ধারণে বিবেচ্য বিষয় কী কী হবে সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা নেই।

অধিকন্তু ৫ নম্বর দফায় বলা হয়েছে ভাড়াটিয়া মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া প্রদান করবেন। অথচ ১৯৯১ সালের আইনানুসারে চুক্তির অবর্তমানে বাড়িভাড়া মাসের পরবর্তী মাসের পনেরো দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলা আছে। যার ফলে ভাড়াটিয়াদের আইনি অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে।

আবার ৭ নম্বর দফায় বলা হয়েছে ভাড়া বাড়ানোর সময় হবে জুন-জুলাই। কোনো ভাড়াটিয়া নিশ্চয় জুন-জুলাই মাসের জন্য অপেক্ষা করে বাড়িভাড়া নেবে না। সেক্ষেত্রে বছরের অন্য সময় কেউ ভাড়া নিলে দুই বছর মেয়াদান্তে জুন-জুলাই না হলে বাড়ির মালিক ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারবেন না; যা মোটেও যৌক্তিক কোনো নির্দেশনা নয় এবং বাড়ির মালিকের স্বার্থ পরিপন্থি।

অপরদিকে, নির্দেশিকার ৯ দফায় বলা হয়েছে কেবল নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করা যাবে। কিন্তু আইনের ১৮ ধারায় আরও কিছু ক্ষেত্র সংযুক্ত করে স্পষ্ট করা হয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারবেন এবং পারবেন না। ফলে, বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ের স্বার্থহানির শঙ্কা রয়েছে।

তা ছাড়া ১৩ দফা আইনের বাইরে গিয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, বাড়িওয়ালা চাইলে এক থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া নিতে পারবেন। যদিও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনানুসারে সর্বোচ্চ এক মাসের ভাড়া অগ্রিম হিসেবে নেওয়ার বিধান রয়েছে। সুতরাং, ভাড়াটিয়াদের ঘাড়ে এখন নতুন নির্দেশিকানুসারে অতিরিক্ত অগ্রিম জমা দেওয়ার দায় চাপানো হয়েছে। অন্যদিকে ১৫ দফায় উল্লেখ রয়েছে যে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে না পারলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। কিন্তু কত সময়ের মধ্যে এবং কী পদ্ধতিতে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতি বিরোধ নিষ্পত্তি করবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। আবার আইনানুযায়ী আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা নেই। যদিও আইনের সাধারণ নীতিনুসারে নির্দেশিকা এবং আইনের মধ্যে সংঘর্ষ হলে অবশ্যই আইন প্রাধান্য পাবে। ফলে এই নির্দেশিকা আসলে কার স্বার্থ সংরক্ষণ করবে তা মোটেও স্পষ্ট নয়।

রাজধানীকেন্দ্রিক বাসা-বাড়ির ব্যাপক চাহিদা, জমির অপ্রাপ্যতা ও আকাশচুম্বী দাম, নির্মাণ-সামগ্রীর অস্থিতিশীল উচ্চমূল্য এবং অস্বাভাবিক নির্মাণ খরচের কারণে ঢাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস ও জীবনযাপন এমনিতেই ভীষণ ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ তাই ব্যয় হয় আবাস স্থলের মতো মৌলিক চাহিদার পেছনে। মড়ার ওপর আবার খাঁড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে সময়মতো বিল পরিশোধ করেও চাহিদামতো বা নিরবচ্ছিন্ন অপরিহার্য নাগরিক সুবিধা, যথাÑ পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রভৃতি না পাওয়া।

১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের মূল সমস্যাই হলো বাজারমূল্য নির্ধারণের কোনো সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি না থাকা। ঢাকার স্থাবর সম্পত্তির (রিয়েল এস্টেট) বাজার অত্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত এবং অস্বচ্ছ। একই ধরনের দুটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য এলাকা, উপকরণ, সুবিধা, প্রতিষ্ঠান ভেদে আকাশ-পাতাল হতে পারে। তবে বাৎসরিক বাড়িভাড়া বাড়ির বর্তমান বাজার মূল্যের ১৫% কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে ৭০ লাখ টাকার একটি ফ্ল্যাটের ১৫% হারে মাসিক ভাড়া ৮৭ হাজার টাকাও বেশি হবে; যা বর্তমান ভাড়ার প্রায় পাঁচ গুণ! ফলে আইনের এই উদ্ভট বিধান ভাড়াটিয়াদের স্বার্থরক্ষার বদলে বাড়ির মালিকদের জন্য ভাড়া বাড়ানোর আইনি হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং আইনের অপব্যবহারের দরজা খুলে দেবে। যদিও আইন ও নির্দেশিকায় মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু মানসম্মত ভাড়া ধার্যের বিস্তারিত পদ্ধতি ও বিবেচ্য বিষয়ে কিছুই বলা নেই।

বাংলাদেশের এই দুরবস্থার বিপরীতে উন্নত বিশ্ব যথাÑ আয়ারল্যান্ডের বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইনে চোখ বুলালে মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণে অধিকতর সুষম ও কার্যকর কাঠামো রয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে। যেমনÑ আয়ারল্যান্ডে এখন চরম আবাসন সংকট চলছে। যার ফলে বাড়িভাড়া আগের তুলনায় অধিক এবং ভাড়া পাওয়াও বেশ কঠিন। তথাপি বাড়িভাড়া বৃদ্ধি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বর্তমান ভাড়ার একটি সর্বোচ্চ বার্ষিক শতাংশের (বর্তমানে সাধারণত ২%) মধ্যে সীমাবদ্ধ। যা একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমেয় ও ভাড়াটিয়াবান্ধব ব্যবস্থা। মালিক ভাড়া বৃদ্ধি করতে চাইলে, অবশ্যই বাজার মূল্যের তুলনায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ভাড়াটিয়াকে নির্ধারিত ফর্মে কমপক্ষে ৯০ দিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে। উচ্ছেদ করতে চাইলেও ভাড়ার ধরন ও ব্যাপ্তি অনুসারে পৃথক পৃথক সময়সীমা নির্ধারণ করা আছে। সাধারণত চুক্তির শর্ত না ভাঙলে, সম্পত্তির সংস্কার বা পরিবারের কারো জন্য প্রয়োজন না হলে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করা যায় না। সেখানে এ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শক্তিশালী একটি স্বাধীন রেসিডেনশিয়াল টেনান্সিজ বোর্ড রয়েছে। আবার বোর্ডে কেউ মামলা দায়ের করে হারলে তাকে জয়ী পক্ষের মামলার সমস্ত খরচ বহন করতে হবে।

আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও বাড়িভাড়া বিষয়ক এই মডেল থেকে আমাদের প্রধান শিক্ষণ হতে পারে। ভাড়া নিয়ন্ত্রণে যৌক্তিক পদ্ধতি গ্রহণ (যেমন এলাকা ও সুবিধাভেদে বাস্তবভিত্তিক সর্বোচ্চ বার্ষিক শতাংশ নির্ধারণ এবং সময় সময় তা পরিমার্জন), নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শক্তিশালী, স্বাধীন ও সহজগম্য বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা (যেমনÑ বাড়িভাড়া ট্রাইব্যুনাল বা বোর্ড) গঠন, জয়ী পক্ষকে খরচ প্রদান প্রভৃতি। যেন আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয়ভার এবং অপ্রয়োজনীয় মামলা এড়ানো যায়।

সরকারের তাই এখন উচিত হবে ‘বাজার মূল্যের ১৫%’-এর পরিবর্তে, স্থানীয় বাজার বিশ্লেষণ, ভবনের মান, প্রদত্ত সুবিধা, এলাকা, প্রদত্ত নাগরিক সেবার মান, বসবাস উপযোগিতা এবং ভাড়াটিয়ার আয়ের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি চালু করা; অবিলম্বে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর প্রয়োজনীয় সংস্কার, আইনের অধীনে স্বত্বর বিধিমালা প্রণয়ন এবং প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় ভাড়া নিয়ন্ত্রক পদ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ করা; বাড়িভাড়া বিরোধ নিষ্পত্তিতে ওয়ার্ডভিত্তিক পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরি; আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ এক মাসের অগ্রিম ভাড়া ও অন্যান্য বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং নজরদারি করা, ইত্যাদি।

ঢাকার ভাড়াটিয়া জনগোষ্ঠী, যারা শহরের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদ-; তারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, বঞ্চনা ও শোষণের শিকার। একটি কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত ভাড়া নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো; যেন উভয় পক্ষের অধিকার সুনির্দিষ্ট এবং একটি দ্রুত প্রতিকার প্রক্রিয়া সবার নাগালের মধ্যে থাকে। সরকার এবং নগর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একটি কল্পনাপ্রসূত নীতিমালা নয়, বরং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। নতুবা, এই নির্দেশিকা বরাবরের মতোই কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, আর বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ারা বহন করবে তার বিপরীতমুখী ফল। এখন তাই সময় এসেছে ঢাকাসহ সারা দেশের আবাসন বাজারের জন্য একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও মানবিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!