ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কতটা কার্যকর

জুয়েল হাসান, প্রকৌশলী, সাংবাদিক এবং কলামিস্ট
প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ০১:৫৬ এএম

ভোরের কুয়াশা যখন ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সূর্যের আলো নগরীর দেয়ালে পড়ে, তখন দৃশ্যমান হয় শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, দৃশ্যত হয় আমাদের রাষ্ট্রচেতনার প্রতিচ্ছবি। কোথাও উঁচু অট্টালিকা, কোথাও অন্ধ গলি, কোথাও স্বচ্ছ কাচের জানালা, কোথাও অস্বচ্ছ দরজা। এই আলো-ছায়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ন্যায় ও অন্যায়ের সূক্ষ্ম লড়াই। দুর্নীতি যেন এক অদৃশ্য ধুলো! যা নিঃশব্দে জমে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর। প্রশ্ন জাগেÑ এই কাঠামো কি যথেষ্ট দৃঢ়, ধুলো ঝেড়ে ফেলে আলোর দিকে দাঁড়ানোর মতো? নাকি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে গিয়ে শুধু শক্তির ভান ধরে রেখেছে?

যেখানে অন্যায়কে নীরবে মেনে নেওয়া হয়, সেখানে ন্যায়বিচার ধীরে ধীরে নির্বাসনে যায়, এই চিরন্তন সত্য আমাদের সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজচিন্তায় বারবার ফিরে এসেছে। কবির কলমে, ঔপন্যাসিকের কাহিনিতে কিংবা প্রাবন্ধিকের যুক্তিতে আমরা দেখেছি ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যক্তিস্বার্থের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিবাদ। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা, রবীন্দ্রনাথের মানবিকতার আহ্বান কিংবা শরৎচন্দ্রের সামাজিক অসাম্যের চিত্র সবখানেই একটি অদৃশ্য প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়: ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াইয়ে সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা দৃঢ়?

দুর্নীতি কোনো একক মানুষের বিচ্যুতি নয়, এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক সামাজিক ব্যাধি, যা রাষ্ট্রের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। যখন আইন প্রণয়নকারী, প্রয়োগকারী ও বিচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুর্বলতা জন্ম নেয়, তখন ব্যক্তির লোভ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে আশ্রয় করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে দুর্নীতি কেবল অর্থ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি ন্যায়বিচারকে বিলম্বিত করে, মেধাকে অবমূল্যায়িত করে এবং সাধারণ মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রশ্নটি নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক সংস্কার, সবই একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত: সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কাগজে-কলমে শক্তিশালী এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কতটা স্বাধীন ও কার্যকর? আইনের কঠোরতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রয়োগের নিরপেক্ষতা তার চেয়েও বেশি জরুরি।

প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে প্রভাবমুক্ত না হয়, তবে তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একইভাবে, প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল নজরদারি, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, এসব আধুনিক উপাদান দুর্নীতি কমাতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এগুলোর সঠিক প্রয়োগ ও তদারকি ছাড়া কাক্সিক্ষত ফল আসে না।

সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কেবল আবেগ নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সেই দায়িত্ব পালনের প্রধান মাধ্যম হলো শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যখন আদালত নিরপেক্ষভাবে রায় দেয়, প্রশাসন স্বচ্ছভাবে কাজ করে এবং গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান চালায়, তখন দুর্নীতির পথ সংকুচিত হয়। কিন্তু যখন এসব স্তম্ভের কোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন দুর্নীতি আবার মাথা তোলে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, প্রতিষ্ঠান বলতে আমরা কী বুঝি। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, হিসাব নিরীক্ষা সংস্থা, নির্বাচন কমিশন, সবই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ। এদের সমন্বিত ও স্বাধীন কার্যক্রমই সুশাসনের ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত ক্ষমতা থাকলেও প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রধান সংস্থা হলোÑ দুর্নীতি দমন কমিশন। আইন অনুযায়ী এ সংস্থার তদন্ত, মামলা ও সুপারিশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে তদন্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক চাপ বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা কতটা প্রভাব ফেলছে? যদি কোনো সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে তার আইনগত শক্তি বাস্তবে কার্যকর হয় না।

বিচার বিভাগের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতিরোধ। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতায় ভুগলে অভিযুক্তরা শাস্তি এড়ানোর সুযোগ পায়। ফলে জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, দুর্নীতির শাস্তি অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাই দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে।

এ ছাড়া প্রশাসনিক কাঠামোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি ক্রয়, টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্ত বায়ন, এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের ঝুঁকি বাড়ে। ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং ও উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার চালু করা হলে প্রক্রিয়াগত দুর্নীতি কমানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তি নিজে সমাধান নয়, এর সঠিক ব্যবহার ও নজরদারি অপরিহার্য।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক সময় বড় বড় অনিয়ম উন্মোচন করে। কিন্তু গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে বা তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধার সম্মুখীন হয়, তবে দুর্নীতি প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়। একইভাবে, নাগরিকদের সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

তবে কেবল প্রতিষ্ঠান গঠন করলেই হবে না, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়িত না হয়, তবে নি¤œস্তরের কর্মকর্তারা শক্ত বার্তা পান না। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান ও নীতি বাস্তবায়নের দৃঢ়তার ওপর।

সার্বিকভাবে বলা যায়, দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কার্যকর হতে পারে যদি তা স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়। আইন, প্রযুক্তি ও নৈতিক নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করলে দুর্নীতির পরিসর সংকুচিত হয়। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল কাগুজে শক্তিতে পরিণত হয়, যা বাস্তব পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে টেকসই লড়াই তাই কেবল ব্যক্তিগত সততার প্রশ্ন নয়; এটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি প্রয়াস।

দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রশ্নে আমরা বারবার ব্যক্তির নৈতিকতা, রাজনৈতিক বক্তব্য বা সাময়িক অভিযানের দিকে তাকাই। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ ব্যক্তির সদিচ্ছা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, প্রতিষ্ঠানই স্থায়ী। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কতটা কার্যকর, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার দিকে।

যে রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, সেখানে দুর্নীতির ঝুঁকি কমে। কারণ অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই সেখানে বিবেচ্য হয়। কিন্তু যদি প্রভাব, ক্ষমতা বা রাজনৈতিক অবস্থান বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কার্যকর থাকে না। সেক্ষেত্রে আইন বইয়ের পাতায় শক্তিশালী থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত অবস্থান ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নির্ভর করে তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর, স্বাধীনতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা। স্বাধীনতা ছাড়া প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। দক্ষতা ছাড়া তদন্ত নিরীক্ষা বা বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। আর স্বচ্ছতা ছাড়া জনআস্থা গড়ে ওঠে না। জনআস্থা না থাকলে প্রতিষ্ঠান তার নৈতিক ভিত্তি হারায়, যা দুর্নীতি প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।

এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান হতে পারে। ডিজিটাল প্রশাসন, অনলাইন টেন্ডারিং, স্বয়ংক্রিয় হিসাব নিরীক্ষা, এসব ব্যবস্থা মানবিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে অনিয়মের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। তবে প্রযুক্তি তখনই কার্যকর, যখন তার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিরপেক্ষ থাকে। অন্যথায় প্রযুক্তিও নতুন ধরনের দুর্নীতির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কেবল আইনি কাঠামোর বিষয় নয় এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গেও জড়িত। শীর্ষ নেতৃত্ব যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেয় এবং তা বাস্তবে প্রতিফলিত করে, তবে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত বার্তা পায়। একইভাবে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম সক্রিয় থাকলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হয়।

অতএব, দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কার্যকর হতে পারে, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন অবিচল নীতি, প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, দক্ষ জনবল এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হয়, তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল স্লোগান থাকে না, তা বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়। আর তখনই বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি শুধু কাঠামো নয়, এটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।