বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুনর্বাসন নতুন কিছু নয়। ফলে পুনর্বাসন শব্দটি কখনোই প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। রাজনীতিতে এ শব্দটি দ্বারা কেবল সাংগঠনিক প্রত্যাবর্তনই বোঝায় না, বরং এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, জনমত, ভোটরাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সমীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই নিষিদ্ধ হওয়া কিংবা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো বড় দলের রাজনীতির মঞ্চে প্রত্যাবর্তন বা পুনর্বাসন হলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ওপর বিভিন্ন দিক থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী। প্রায় দেড় হাজার লোক হত্যা করে সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার গংদের ভারতে পলায়নের পর আওয়ামী লীগ এখন কোণঠাসা। দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ভারতে পালিয়ে গেলেও দেশে তাদের কট্টর কিছু সমর্থক এখনো রয়ে গেছে। তাদের লক্ষ্য করেই গত সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে আওয়ামীপ্রীতি প্রদর্শনের নমুনা দেখা গেছে। ঘুরে-ফিরে আওয়ামীঘেঁষা বয়ান, বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে দেখা গেছে। ফলে অনেকেই বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সে সময় প্রশ্ন তুলেছিলেন। এনসিপিসহ অনেকেই অভিযোগ করেছেন, বিএনপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন কার্যক্রমের পথ খুলছে।
সংসদীয় ভোটাভুটি শেষ। বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। প্রশ্ন হলোÑ বিএনপির এখনকার অবস্থান কী? তারা কি আওয়ামী লীগঘেঁষা নির্বাচনি অবস্থানেই এখনো আছে, নাকি সেখান থেকে সরে এসেছে? আওয়ামীপ্রীতির দৃষ্টিকটু বক্তৃতা-বিবৃতি কি কেবল ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষ জামায়াতকে ঘায়েল করার জন্যই ছিল, নাকি আসলেই বিএনপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে পুনর্বাসিত হবে? এই আলাপটি তোলা অনেকগুলো কারণেই জরুরি। আওয়ামী লীগ যদি পুনর্বাসিত হয়, তবে সেটি শুধু দেশীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তাতে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ যেমন পাল্টে যাবে, তেমনি দল হিসেবে বিএনপি কিছু কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, যখন এক পক্ষ শক্তিশালীভাবে সংগঠিত এবং মাঠদখলে সক্রিয় থাকে, তখন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হতে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে যদি কোণঠাসা বা দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিপক্ষ নতুন উদ্যমে সুসংগঠিত হয়ে ময়দানে ফিরে আসে বা আসার সুযোগ পায়, তখন পূর্ব থেকে মাঠদখলে থাকা পক্ষের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে।
এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে দীর্ঘদিন কোণঠাসা হয়ে থাকা প্রতিপক্ষও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ পুনর্বাসিত হলে বিএনপি এ রকম কী কী জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, তা কয়েকটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অঞ্চল, শ্রেণি ও মতাদর্শভিত্তিক ভোটের জোয়ার রয়েছে। গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রতিশ্রুতিতে আওয়ামীঘেঁষা নীতি উপস্থাপনের কারণে সফলভাবেই আওয়ামী লীগের অনেক ভোট বাগাতে পেরেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে বিএনপির এই ভোটব্যাংক তছনছ হয়ে যাবে। কেননা, যদি প্রান্তিক অবস্থানে থাকা কোনো দল পুনরায় সফলভাবে সক্রিয় হয়, তাহলে পূর্বের সমর্থকরা তাদের আগের দলের দিকে ঝুঁকে পড়বে।
এতে পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির ভোটের হার কমে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নির্বাচনি ফলাফলে দেখা গেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ২৯০ জন বিএনপি প্রার্থীর মোট ভোটের হার ৪৯.৯৭ শতাংশ। অপরদিকে বিএনপির চেয়ে কমসংখ্যক প্রার্থী দিয়েও জামায়াতে ইসলামী তাদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ২২৭ জন প্রার্থীর মাধ্যমে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। ফল বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ৪৯টি আসনে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নিশ্চিত হয়েছে। ঢাকা-১৭ আসনে মাত্র ৪ হাজার ৩৯৯ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে হারিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাস এনসিপির নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীর থেকে মাত্র ৫ হাজার ২৩৯ ভোট বেশি পেয়েছেন।
কিছু আসনে বিএনপি প্রার্থীরাও অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভোটের ব্যবধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে খুব বেশি নয়। বিএনপির মোট ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগের ভোটও যুক্ত রয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ পুনর্বাসিত হলে চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগের ভোট পাবে না। ফলে তাদের ভোটের হার স্বভাবতই কমে যাবে, যা বিএনপির সংসদীয় আসন জেতার ক্ষেত্রে বেশ ঝুঁকি তৈরি করবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা বিভিন্ন কারণে ধীরে ধীরে কমে, আর বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা বাড়ে। এই বিবেচনায় পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির জনপ্রিয়তা যদি আসলেই কমে যায়, তাহলে তাদের সংসদীয় আসনের ফলাফলে বিপর্যয় নামতে পারে। একদিকে আওয়ামী লীগের ভোট হারানো ও দলের জনপ্রিয়তা হ্রাস; অপরদিকে বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরাÑ এগুলোর মিলিত প্রভাব বিএনপির ভোটব্যাংককে বড় ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাবে। তাই আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে বিএনপির পক্ষে একচেটিয়া মিডিয়া কাভারেজ ও আন্তর্জাতিক মিত্রের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে। ৫ আগস্টের আগের ও পরের মিডিয়া হাউসগুলোর চরিত্রে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। যে মিডিয়া হাউসগুলো একসময় আওয়ামী তোষণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকত, তারাই হঠাৎ ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপি তোষণে মশগুল হয়ে গেছে। একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানের ভাষায়, ‘এ যেন এক ম্যাজিক!’ কিন্তু আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে মিডিয়া হাউসগুলোর অবস্থান আবার রাতারাতি পাল্টে যাবে। আওয়ামী মিডিয়াগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠবেÑ আওয়ামী স্বৈরাচারী বয়ান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে কীভাবে স্বৈরাচারী হাসিনার গুণকীর্তন করা যায়, কীভাবে জঙ্গি নাটকের বৈধতা উৎপাদন করা যায়, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে দেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বৃত্তে বন্দি করা যায়, কীভাবে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করা যায়Ñ সেই কাজে।
আওয়ামী পুনর্বাসনে একইভাবে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে যারা সম্পর্ক সৃষ্টি করতে চাচ্ছে বা করছে, তাদের মধ্য থেকে অনেকেই বিএনপি থেকে দূরে সরে যেতে পারে। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতায় বিএনপি চাপে পড়বে। পরিস্থিতি সঠিকভাবে সামাল দিতে না পারলে বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ফিরে এলে সেই আওয়ামী লীগ আর পূর্বের আওয়ামী লীগের মতো থাকবে না। বরং প্রত্যাবর্তিত আওয়ামী লীগ হবে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি হিংস্র, নৃশংস ও বেপরোয়া। কারণ, ছাত্র-জনতার এত বড় বিপ্লবের মুখে দেশত্যাগ করা নেতৃত্ব যখন কয়েক বছরের মধ্যে পুনরায় ফিরতে সক্ষম হবে, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস হবে পর্বতসমান। শত শত গুম, খুন, দুর্নীতি, অত্যাচার করে, সহস্রাধিক মানুষ হত্যা করে কোনো রকম সাজা ভোগ না করে ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসার কারণে আওয়ামী লীগ রূপান্তরিত হবে নাৎসি প্রো ম্যাক্সে।
তখন বিএনপি-জামায়াতসহ সব বিরোধী নেতা-কর্মীর ওপর অকল্পনীয় দুর্যোগ নেমে আসবে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা তো ইতোমধ্যে এ রকম হুমকি দিয়েই ফেলেছেন। চতুর্থত, বিএনপির হাত ধরে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে জুলাই অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এমনকি বিএনপির ভেতরে থাকা জুলাইযোদ্ধারাও আর বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে পারবে না। সাধারণ মানুষসহ তরুণ ভোটারদের ওপর এর তীব্র প্রভাব পড়বে।
ইতিহাসের পাতায় বিএনপি ‘বিশ্বাসঘাতক’ দল হিসেবে চিহ্নিত এবং কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। বিএনপিকে ভবিষ্যতে কেউ আর বিশ্বাস করতে চাইবে না। এভাবে ধীরে ধীরে বিএনপির রাজনৈতিক সংকট গুরুতর হতে থাকবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ পুনরায় সক্রিয় হলে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের মনোবলেও প্রভাব পড়তে পারে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ফিরে এলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে এবং আধিপত্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও সংকট তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতায় দলটি কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন