মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা এখন আর নেই। হয়ে গেছে ধূ ধূ মরুভূমি। শুধু ফারাক্কা বাঁধের কারণে। যা উত্তরাঞ্চল তথা নদী বিধৌত বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অর্ধ শতাব্দী ধরে। যার নাম শুনলেই মরা পদ্মা ডুকরে মাথা কুটে মরে বিস্তীর্ণ বালিগর্ভে।
কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৫১ সালে, নির্মাণ শুরু হয় ১৯৬১ সালে এবং স্বাধীনতার পর দ্রুত কাজ শেষ করে ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে ‘মুজিব-ইন্দিরা’ সমঝোতার ভিত্তিতে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে পানি প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হয়। মাত্র ৪১ দিনের এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমই পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় রূপ নেয়, যার প্রভাব আজও পদ্মা অববাহিকার মানুষের জীবনে অনুভূত হচ্ছে।
১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট প্রবাহের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগির বিধান রাখা হয় এবং বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ ছিল। পরে ১৯৮২ সালে দুই বছর মেয়াদি এবং ১৯৮৫ সালে তিন বছর মেয়াদি (১৯৮৬-৮৮) সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়, যেখানে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত প্রবাহ ভাগাভাগি এবং সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তার কথা বলা হয়। তবে শুষ্ক মৌসুমে চুক্তি অনুযায়ী পানির প্রাপ্যতা নিয়ে বিতর্ক ও মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে।
ফারাক্কার কারণে পদ্মায় বছরের প্রায় ৮ মাসই পানি থাকে না। এ বাঁধের কারণে পদ্মা নদী রাজশাহী শহর থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রকৃতি ও আবহাওয়া রীতিমতো বদলে গেছে। এসব অঞ্চলে বিশেষত রাজশাহীতে গ্রীষ্মকালে প্রচ- গরম এবং শীতকালে প্রচ- শীত বিরাজ করে। নদীর পলি কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এক ফারাক্কার কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০ কিমি নদীপথ নাব্য হারিয়েছে এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৪৯টি শাখা নদী বিলীন হয়ে গেছে। পরিবেশে আকস্মিক বন্যা, খরা ইত্যাদি নানা দুর্যোগ বেড়ে গেছে। তা ছাড়া, খুলনা, গোপালগঞ্জ, নড়াইল প্রভৃতি জেলায় লবণাক্ততার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। হিসাব মতে, আর্থিক মূল্যে ফারাক্কার জন্য বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ডধঃবৎ খধি অনুসারে ঊয়ঁরঃধনষব ঁঃরষরুধঃরড়হ: আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে পানি বণ্টনের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘড় ংরমহরভরপধহঃ যধৎস: উজানের রাষ্ট্র ভাটির রাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারবে না।
চৎরড়ৎ হড়ঃরভরপধঃরড়হ: আন্তঃসীমান্ত নদীতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশকে জানানো এবং মতামত নিতে হবে।
পড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ বা সহযোগিতা আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। পানি নিয়ে প্রতিযোগিতা নয়, বরং যৌথ ব্যবস্থাপনা। এটাই আধুনিক কূটনীতির লক্ষ্য।
এই আইনের আলোকে বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। চাপ ভারতের অনৈতিক-অন্যায্যভাবে পানি বণ্টন বন্ধ করতে হবে।
চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পানি সমস্যার সমাধানে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করে নদী আইনগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।
পৃথিবীতে অনেক আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে যাদের পানি একাধিক দেশ বণ্টন করে নিচ্ছে। যেমনÑ মেকং নদীর পানি কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনাম সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করে নিচ্ছে। ইউরোপের দানিয়ুব নদীর পানি পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ১২টি দেশ ভোগ করছে। এমনকি ‘চিরশত্রু’ পাকিস্তানের কাছ থেকে সিন্ধু নদীর পানি ভারত ভোগ করছে।
ফারাক্কা চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশ সরকারে নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের চাহিদা, অধিকার আদায় করার সদিচ্ছামূলক নীতি গ্রহণ করা জরুরি। মাওলানা ভাসানী লংমার্চের সময় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আরও বলেছিলেন, ‘ভারত সরকারের জানা উচিত, বাংলাদেশিরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না, কারো হুমকিকে পরোয়া করে না।’ তাই কোনো ধরনের নতজানুমূলক কূটনীতি নয় বরং দেশের স্বার্থ রক্ষায় করাই ফারাক্কার চুক্তির নতুন রূপ হোক। ফারাক্কা চুক্তি নবায়নের পূর্বে ফারাক্কা বন্ধের চুক্তি করাই বাংলাদেশ ও ভারতের পদ্মা এবং গঙ্গা তীরবর্তী মানুষের আকাক্সক্ষা।

